
গ্রামের এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের সঙ্গে আলাপেই প্রথম জানলাম বাইন্যান্সের কথা। ছোট একটি ইলেকট্রনিক্স দোকানে কাজ করা সেই তরুণ মাসের শেষে নিয়ম করে দুবাই–প্রবাসী ভাইকে টাকা পাঠান। মুখে সন্তুষ্টির হাসি—’বাইন্যান্সে পাঠাই, খুব সহজ।’ যেন এমন কোনো গোপন শর্টকাট তিনি জেনে ফেলেছেন, যা আমাদের অজানা।
তিনি ধাপে ধাপে বুঝিয়ে দিলেন তার পুরো প্রক্রিয়া। দোকানের গ্রাহকদের কাছ থেকে নগদ টাকা নিয়ে নিজের মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টে ছোট ছোট অংকে জমা করেন। পরে বাইন্যান্সে লগইন করে পি-টু-পি মার্কেটপ্লেসে ভালো দামে ইউএসডিটি বিক্রি করছেন এমন কাউকে খুঁজে নেন। এমএফএস বা ব্যাংকের মাধ্যমে বিক্রেতাকে টাকা পাঠান, আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তার ওয়ালেটে জমা হয় ইউএসডিটি—কোথায় গেল টাকা, কে পাঠালো, কোনো প্রশ্নই নেই।
এরপর আরও সহজ ধাপ—দুবাইতে থাকা ভাইকে তার ওয়ালেট ঠিকানা পাঠাতে বলেন এবং সরাসরি ক্রিপ্টো ট্রান্সফার করে দেন। পাঁচ মিনিটের কাজ। ওদিকে ভাই অন্য একটি পি-টু-পি ট্রেডারের মাধ্যমে সেই ইউএসডিটি ভাঙিয়ে হাতে দিরহাম পান—নেই কোনো রেকর্ড, নেই কোনো কর, নেই কোনো ট্রেস।
তিনি জানতেন না যে এই পুরো প্রক্রিয়াই বাংলাদেশের আইনে মানি লন্ডারিং। বলার পরেও বিষয়টি তার তেমন গুরুত্ব পায়নি।
২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত বাইন্যান্স এখন বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ক্রিপ্টো ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম। এর মূল সম্পদ ইউএসডিটি—ডলারের সঙ্গে সমমূল্যের একটি স্টেবলকয়েন। বাংলাদেশের হাজারো ব্যবহারকারী প্রতিদিন এটি ব্যবহার করছেন। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের সঙ্গে কথা বলা এক অভিজ্ঞ ট্রেডার বললেন, ‘আপনার কাছে টাকা থাকলেই হলো, পি-টু-পি দিয়ে কয়েক মিনিটে ইউএসডিটি কিনে পৃথিবীর যেকোনো দেশে পাঠাতে পারবেন। অনেকটা হুন্ডির মতোই।’
২০২৩ সালে সিআইডি এই নেটওয়ার্কের ব্যাপকতা শনাক্ত করে। শুধু একটি মোবাইল নম্বর দিয়েই ২৫ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। যদিও ২০১৪ সাল থেকে বাংলাদেশে ক্রিপ্টো নিষিদ্ধ, তবুও ধারণা করা হয় প্রায় ৪০ লাখ মানুষ কোনো না কোনোভাবে এতে যুক্ত।
ক্রিপ্টো কেন থামানো যাচ্ছে না, তার ব্যাখ্যা দিলেন ঢাবির আইআইটির পরিচালক অধ্যাপক ড. বি. এম. মইনুল হোসেন। তাঁর মতে, ক্রিপ্টো অনেকটাই ইমেইলের মতো—নিষিদ্ধ করলেও ভিপিএন ও বিকল্প উপায়ে ব্যবহার চলবেই। কারণ এটি নিয়ন্ত্রণ করার কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ নেই।
সরকারি পর্যায়ের উদ্বেগও বাড়ছে। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব জানান, সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন ও অনলাইন জুয়ার অর্থ ক্রিপ্টো দিয়ে পাচার হচ্ছে কিনা—এ নিয়ে গভীর নজরদারি প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিকভাবে ক্রিপ্টো লেনদেন এখন বড় মাথাব্যথার কারণ। গত দুই বছরে ২৮ বিলিয়ন ডলারের অবৈধ লেনদেন হয়েছে বিশ্বজুড়ে। উত্তর কোরিয়ার হ্যাকার গ্রুপ থেকে শুরু করে বড় প্রতারক নেটওয়ার্ক—সবাই ব্যবহার করছে বাইন্যান্স, ওকেএক্স ও বাইবিটের মতো এক্সচেঞ্জ।
তাই বিশ্বব্যাপী নিষিদ্ধের বদলে নিয়ন্ত্রণেই জোর দেওয়া হচ্ছে। এফএটিএফ সব দেশকে বাধ্য করছে এক্সচেঞ্জ ও ওয়ালেট প্ল্যাটফর্মগুলোকে কেওয়াইসি, রিপোর্টিং ও তথ্য বিনিময়ের আওতায় আনতে। ইইউর মাইকা আইন, যুক্তরাজ্যের কঠোর মনিটরিং, দুবাই–আবুধাবির লাইসেন্সিং—সবই এই নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর অংশ।
কিন্তু যতদিন পর্যন্ত এই শূন্যতা থাকবে, অপরাধীরা সুযোগ নেবে। আর গ্রামের সেই তরুণের মতো সাধারণ মানুষ, না জেনেই হয়ে উঠবে একটি বৃহৎ বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের অংশ।