
মোতালেব প্লাজায় বর্তমানে টেকনিশিয়ানের সংখ্যা প্রায় ১,৫০০। এর মধ্যে মাত্র ৫০ জন ‘এ’ ক্যাটাগরির, ৩০০ জন ‘বি’ ক্যাটাগরির, বাকিরা সবাই ‘সি’ ক্যাটাগরির—অর্থাৎ অল্পকিছু দক্ষ টেকনিশিয়ানের বিপরীতে বিপুলসংখ্যক অদক্ষ কর্মী। দেশের অন্যান্য আইটি মার্কেটেও ছবিটা প্রায় একই। কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়—দক্ষতা উন্নয়নের উপযুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই, বেশিরভাগ প্রশিক্ষণই স্বল্পমেয়াদি, আর যারা পেশায় আসেন তাদের লক্ষ্য থাকে শুধু একটি চাকরি পাওয়া পর্যন্ত।
মোস্তাফিজুর রহমান বিপ্লবের ভাষায়, দেশে প্রায় ৭ কোটি স্মার্টফোন ব্যবহারকারী থাকলেও দক্ষ টেকনিশিয়ানের সংখ্যা খুবই কম। অদক্ষ টেকনিশিয়ানদের কাজ নষ্ট করার প্রবণতা কাস্টমারদের আস্থা আরও কমিয়ে দিচ্ছে।
কিউকিউ রিপেয়ারের এসএ কাইয়ুমও মনে করেন, দেশের ৯০ শতাংশ টেকনিশিয়ান অদক্ষ। তার মতে, যেই কাজ বাংলাদেশে এক হাজার টাকায় হয়, বিদেশে একই কাজের মূল্য দুই-তিনগুণ। অনেকেই মাসে ২৫ থেকে ৩৫ হাজার টাকার চাকরিতে কোনোভাবে সংসার চালান। তবে কাইয়ুমের মতে, এই পেশায় একটি সামাজিক সম্মান থাকে—যা অনেকেই গুরুত্ব দেন।
অন্যদিকে, মিরপুর শাহ আলী মার্কেটের টেকনিশিয়ান ওয়াসিম মাহমুদের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার কথায়, অদক্ষ টেকনিশিয়ানের সংখ্যাধিক্যে বাজারে প্রতিযোগিতা বিশৃঙ্খল হয়ে গেছে। ‘কলম্যান’—অর্থাৎ আসল টেকনিশিয়ান নয়, এমন লোকজনও বহু দোকানে কাজ করছে। ফলে কাস্টমারদের আস্থা নষ্ট হচ্ছে, আর অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ানরা কাজ পাচ্ছেন না। ব্যবসায় ধস নেমে ওয়াসিম প্রতিদিনের খরচই তুলতে হিমশিম খান।
একই মার্কেটেই আবার মোখলেছুর রহমানের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ বিপরীত। ১২ বছরের অভিজ্ঞতায় তিনি এতটাই বিশ্বস্ত হয়েছেন যে কাস্টমাররা ফোন রেখে শুধু নিয়ে যাওয়ার সময় জেনে যান। তার কাজের চাপ এত বেশি যে অনেকদিন দুপুরে খাওয়ারও সময় পান না।
দক্ষ টেকনিশিয়ান হওয়ার বিষয়ে কাইয়ুম বলেন, যন্ত্রপাতি বদলায়, মডেল বদলায়—এ পেশায় নিয়মিত শেখা জরুরি। কারিগরি প্রতিষ্ঠানে তত্ত্ব শেখানো হলেও হাতে-কলমে দক্ষতা কম তৈরি হয়। একজন ভালো ওস্তাদের অধীনে শেখাই ব্যবহারিক দক্ষতা গড়ে তোলে।
মহল্লার দোকানদারদের অভিজ্ঞতা আবার ভিন্ন রকম। মিরপুরের ইউসুফ আলী সুজন বলেন, মহল্লার দোকানে সম্পর্ক ভালো থাকায় কাজ সময় নিয়ে করা যায়, তাড়া কম থাকে। তবে পরিচিত মানুষ বেশি হওয়ায় সার্ভিস চার্জ ঠিকঠাক নেওয়া যায় না। কাস্টমারের সংখ্যাও অনিশ্চিত।
মোতালেব প্লাজার প্রশিক্ষক নিজামউদ্দিন রুবেল মনে করেন, ভালো টেকনিশিয়ান হতে হলে ইংরেজি পড়ার ক্ষমতা, কারিগরি মনোযোগ ও সমস্যা সমাধানের নেশা থাকা জরুরি। তার মতে, টাচফোনের অনেক সাধারণ সমস্যার সমাধান সহজ হলেও ডিসপ্লে গ্রিন হওয়া, সিপিইউ গরম হওয়া বা গ্রিল লাইন তৈরি হওয়ার মতো জটিল বিষয় বুঝে ঠিক করতে হলে গভীর দক্ষতা লাগে।
এ পেশার ভবিষ্যৎ নিয়ে রুবেল আশাবাদী। তার মতে, মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সবকিছুই এখন স্মার্টফোননির্ভর—যা ভবিষ্যতে মোবাইল টেকনিশিয়ানের চাহিদা আরও বাড়াবে।
চুয়াডাঙ্গা থেকে শুরু করে মোতালেব প্লাজায় প্রতিষ্ঠা—বিপ্লবের পথচলার গল্পও উল্লেখযোগ্য। স্থানীয়ভাবে ফোন সারানোর সমাধান না পেয়ে আগ্রহ জন্মে, করোনাকালে গভীর মনোযোগে শেখেন, পরে ঢাকায় এসে একজন দক্ষ ওস্তাদের অধীনে কাজ করেন। তাঁর শেখার আগ্রহ দেখে ওস্তাদ তাকে দ্রুত এগিয়ে দেন। ফেসবুকে নিয়মিত টেকনিক্যাল পোস্ট করে জনপ্রিয়তা বাড়ান। পরে নিজের শপও খুলেছেন—যা এখন মোতালেব প্লাজার পরিচিত ব্র্যান্ড।
বিপ্লবের মতে, সফল টেকনিশিয়ানের মূল গুণ হলো—ধৈর্য, সততা এবং সূক্ষ্মভাবে কাজ করার দক্ষতা। “মোবাইল খুললেই হাত নরম হয়ে আসে”—এটাকে তিনি অপরিহার্য মনে করেন, কারণ সামান্য ভুলেই ক্ষতি হতে পারে লাখ টাকার ফোনে।