জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ২০২৪-২৫ অর্থবছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশের রপ্তানিতে শীর্ষে রয়েছে দক্ষিণ কোরীয় উদ্যোক্তা কিহাক সাংয়ের মালিকানাধীন ইয়াংওয়ান করপোরেশন। দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থান দখল করেছে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি এ কে আজাদের মালিকানাধীন হা-মীম গ্রুপ।
শীর্ষ দশ রপ্তানিকারক শিল্প গ্রুপের মধ্যে রয়েছে মণ্ডল গ্রুপ, ডিবিএল গ্রুপ, অনন্ত, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ, স্কয়ার গ্রুপ, পলমল গ্রুপ, প্যাসিফিক জিনস গ্রুপ এবং মাইক্রো ফাইবার গ্রুপ। এই দশটি গ্রুপের রপ্তানির ৯০-১০০ শতাংশই তৈরি পোশাক; ব্যতিক্রম শুধু প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ, যার পণ্য বৈচিত্র্যময়—কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, জুতা, আসবাব, প্লাস্টিক ও হালকা প্রকৌশল পণ্যসহ প্রায় সব ধরনের পণ্য রয়েছে।
ইয়াংওয়ান করপোরেশন:
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ৪৫ বছর আগে যাত্রা শুরু করা ইয়াংওয়ান করপোরেশনের রপ্তানি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ৯৭ কোটি ডলার। এর মধ্যে ৯৪ শতাংশই তৈরি পোশাক। প্রতি পিস পোশাকের গড়ে রপ্তানি মূল্য ২৩ ডলার, সবচেয়ে দামি জ্যাকেটের রপ্তানি মূল্য ৪৪৮ ডলার। ইয়াংওয়ানের পণ্য ৪৮টি দেশে রপ্তানি হয়, যার মধ্যে অ্যাডিডাস, রাল্ফ লরেন, লুলুলেমন, আমের স্পোর্টস, ম্যামুথ স্পোর্টসের মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের ক্রেতা রয়েছে।
হা-মীম গ্রুপ:
দেশীয় শিল্প গ্রুপগুলোর মধ্যে হা-মীম গ্রুপের রপ্তানি ৬৫ কোটি ডলার। রপ্তানির ৭১ শতাংশ গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র। প্রতিষ্ঠানটি ৬৩টি দেশে পোশাক রপ্তানি করছে। হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ জানিয়েছেন, “আমরা বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের দিকে এগোচ্ছি। মার্কিন শুল্কের চাপ থাকলেও উৎপাদন ও রপ্তানির পরিমাণ বাড়াতে কাজ করে যাচ্ছি।”
মণ্ডল ও ডিবিএল গ্রুপ:
মণ্ডল গ্রুপ গত অর্থবছরে ২৬ কোটি পিস পোশাক রপ্তানি করেছে। ডিবিএল গ্রুপের রপ্তানি ৫২ কোটি ডলার, যার মধ্যে পোশাক ছাড়াও ওষুধ ও সিরামিকস অন্তর্ভুক্ত। ডিবিএল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান এম এ রহিম বলেন, “ময়মনসিংহে নতুন কারখানা অধিগ্রহণ করেছি। সংযোগশিল্পেও বিনিয়োগ করা হচ্ছে। আশা করি রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ৫-১০ শতাংশ থাকবে।”
অনন্ত ও প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ:
অনন্ত গ্রুপের রপ্তানি ৪৬ কোটি ২১ লাখ ডলার। নরসিংদীতে নতুন সিনথেটিক কাপড় কারখানা উৎপাদনে গেলে রপ্তানি আরও বাড়বে।
প্রাণ-আরএফএল বৈচিত্র্যময় পণ্য রপ্তানির একমাত্র শিল্প গ্রুপ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪৪ কোটি ৮৭ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যার মধ্যে কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যই প্রধান। তারা প্রায় ২ হাজার প্রকার পণ্য রপ্তানি করে।
স্কয়ার, পলমল, প্যাসিফিক জিনস ও মাইক্রো ফাইবার:
স্কয়ার গ্রুপের রপ্তানি বেড়েছে ২০ শতাংশ, পলমল ৮ শতাংশ। প্যাসিফিক জিনস গ্রুপের রপ্তানি সামান্য বেড়েছে, প্রতি পিস পোশাকের গড় মূল্য ৯ ডলার। মাইক্রো ফাইবার গ্রুপের রপ্তানি ৩৯ কোটি ৩৯ লাখ ডলার, ৯৮ শতাংশের গন্তব্য ইইউ।
শীর্ষ ১০ থেকে বের হওয়া গ্রুপ:
বেক্সিমকো ও স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শীর্ষ দশে জায়গা পায়নি। বেক্সিমকো গ্রুপের রপ্তানি ৭৯ শতাংশ কমে ৯.৯৪ কোটি ডলার হয়েছে। স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের রপ্তানি ৩৪.৯৫ কোটি ডলার।
অর্থনীতিবিদ ও শিল্প নেতাদের মন্তব্য:
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, “রপ্তানি বৃদ্ধির পাশাপাশি ভ্যালু অ্যাডেড বা উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে নজর দিলে অগ্রগতি টেকসই হবে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত হবেন।”
বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের শীর্ষ শিল্প গ্রুপগুলো এভাবে বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছে, পাশাপাশি স্থানীয় কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির দৃঢ় ভিত্তি তৈরি করছে।