• হোম > অর্থনীতি > অর্থনীতি চাপের মুখে, সুদের হার আরও বাজারভিত্তিক করার পরামর্শ আইএমএফের

অর্থনীতি চাপের মুখে, সুদের হার আরও বাজারভিত্তিক করার পরামর্শ আইএমএফের

  • শুক্রবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৫, ১২:২০
  • ৫০

---

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো চাপের মুখে— এমন মূল্যায়ন দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। বৃহস্পতিবার (৩০ অক্টোবর) বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সংস্থাটি জানায়, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বজায় রাখা জরুরি। একইসঙ্গে তারা সুদের হারকে আরও বাজারনির্ভর করার পরামর্শ দিয়েছে, যাতে মুদ্রানীতি কার্যকর হয় এবং বাজারে স্বচ্ছতা বাড়ে।

আইএমএফের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশ গত দুই বছর ধরে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি—এই দুই চ্যালেঞ্জের সঙ্গে লড়ছে। সংস্থাটির প্রতিনিধিদল জানায়, মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে হলে বর্তমান নীতি ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বৈঠকে জানিয়েছে, সেপ্টেম্বর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি নেমে এসেছে ৮.৩৬ শতাংশে, যা পূর্ববর্তী মাসগুলোর তুলনায় কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন। তবে আইএমএফ বলেছে— “এই অগ্রগতি ধরে রাখা এখনই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।”


খেলাপি ঋণে উদ্বেগ

বৈঠকে খেলাপি ঋণ ইস্যুতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইএমএফ প্রতিনিধিদল। সংস্থার শর্ত অনুযায়ী, সরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার কথা থাকলেও বর্তমানে তা ৪০ শতাংশ ছাড়িয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের জুন শেষে দেশে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬৭ হাজার কোটি টাকা— যা মাত্র এক বছরে প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা বেড়েছে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপির হারও ১০ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যেখানে লক্ষ্য ছিল ৫ শতাংশের নিচে রাখা।

আইএমএফের এক কর্মকর্তা বলেন,

“খেলাপি ঋণ শুধু আর্থিক নয়, এটি একটি নৈতিক সংকটও। যতদিন পর্যন্ত দায়বদ্ধতা নিশ্চিত না হবে, ততদিন অর্থনীতি স্থিতিশীল হবে না।”


ইডিএফ ও রিজার্ভ ব্যবহারে প্রশ্ন

রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) গঠনে রিজার্ভের ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আইএমএফ। সংস্থাটি জানতে চায়, রিজার্ভ কি টেকসই সীমার মধ্যে থেকে ব্যবহার করা হচ্ছে, এবং এসব অর্থ ফেরত আসছে কি না।

এছাড়া ‘লেন্ডার অব দ্য লাস্ট রিসোর্ট’ নীতির আওতায় জামানতবিহীন তারল্য সহায়তা দেওয়ার বিষয়েও তারা আপত্তি জানায়। সূত্র জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ৫২ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে কয়েকটি দুর্বল ব্যাংককে, যাদের কাছে কোনো বিল বা বন্ড ছিল না— শুধুমাত্র ‘প্রমিজরি নোট’ দিয়ে এই অর্থ নেওয়া হয়েছে। আইএমএফ এটিকে “উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ইনসিকিউর্ড লেন্ডিং” আখ্যা দিয়েছে এবং অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।


রিজার্ভে স্বস্তি, রাজস্বে উদ্বেগ

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, বর্তমানে দেশের নিট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ২০.৫ বিলিয়ন ডলার, যা আইএমএফের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। এই অবস্থাকে ইতিবাচক উন্নয়ন হিসেবে স্বীকার করেছে সংস্থাটি।

তবে রাজস্ব ঘাটতি এবং কর-জিডিপি অনুপাতের দুর্বলতা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে তারা। আইএমএফের মতে, রাজস্ব আহরণের পরিধি না বাড়ালে ভবিষ্যতে ঋণনির্ভর অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়বে।


সংস্কার নিয়ে অনিশ্চয়তা

২০২২ সালে দীর্ঘ আলোচনার পর ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ৪৭০ কোটি ডলারের আইএমএফ ঋণ চুক্তি করে, যা পরে বাড়িয়ে ৫.৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। এখন পর্যন্ত পাঁচটি কিস্তিতে ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে বাংলাদেশ।

তবে ষষ্ঠ কিস্তি, যা ডিসেম্বর মাসে ছাড় হওয়ার কথা ছিল, তা নিয়ে এখন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আইএমএফ জানতে চায়, “নির্বাচনের পরেও সংস্কার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে কি না।” অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের মতে,

“আইএমএফ চায় রাজনৈতিক স্থিতি এবং নীতিগত ধারাবাহিকতার নিশ্চয়তা। সে কারণেই ষষ্ঠ কিস্তি মার্চ বা এপ্রিলে ছাড় হতে পারে।”


বৈঠকের অংশগ্রহণকারীরা

বৃহস্পতিবারের বৈঠকে আইএমএফ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন সংস্থাটির ডেভেলপমেন্ট ম্যাক্রো ইকোনমিকস প্রধান ক্রিস পাপাজর্জিও, আর বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে নেতৃত্ব দেন ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান। উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি গভর্নর নুরুন নাহার, ড. এজাজুল ইসলামসহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী জানান,

“মূল্যস্ফীতি, সুদের হার, রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা ও খেলাপি ঋণ নিয়ে আইএমএফ বিস্তারিত আলোচনা করেছে। এটি তাদের নিয়মিত রিভিউ মিশনের অংশ।”


মানবিক প্রেক্ষাপট:

অর্থনীতির এই জটিল পরিসংখ্যানের পেছনে লুকিয়ে আছে সাধারণ মানুষের জীবনযুদ্ধ। বাজারে পণ্যের দাম সামান্য কমলেও মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য তা আরও দূরের স্বপ্ন।

এক বেসরকারি চাকরিজীবী বলেন,

“ডলারের দাম, ব্যাংকের সুদ—সব কিছু নিয়ন্ত্রণে আছে বলে শুনি, কিন্তু বাজারে তার কোনো প্রভাব দেখি না। বেতন বাড়ে না, দাম বাড়ে প্রতিদিন।”

অর্থনীতির স্থিতি ফিরে পেতে প্রয়োজন শুধু নীতি নয়, মানুষের আস্থা— যা পুনর্গঠনই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/6156 ,   Print Date & Time: Wednesday, 4 February 2026, 01:23:17 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh