ক্রীড়াজগতে সৌদি আরবের ঢেউ তোলার প্রচেষ্টা ২০৩৪ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের মধ্য দিয়ে নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে চলেছে। তবে এবার সেই উচ্চতা শুধু প্রতীকী নয়—আক্ষরিক অর্থেই আকাশছোঁয়া। ৩৫০ মিটার উচ্চতায় ফুটবল মাঠ নির্মাণের সাহসী ধারণা নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে সৌদি আরবের প্রস্তাবিত ‘নিওম স্টেডিয়াম’।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এই স্টেডিয়ামের ধারণাচিত্র বিশ্বব্যাপী ক্রীড়াপ্রেমীদের বিস্মিত করেছে। একেবারে আকাশের কোলে ভাসমান এই মাঠের নকশা যেন ভবিষ্যতের শহর ‘দ্য লাইন’-এরই এক প্রতিচ্ছবি—যেখানে প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও স্থাপত্যের মেলবন্ধন ঘটছে এক অনন্য স্বপ্নে।
⚽ আকাশের কোলে ফুটবল—এক নতুন বাস্তবতা
ফিফাকে জমা দেওয়া সৌদি আরবের বিড বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে—“নিওম স্টেডিয়াম হবে বিশ্বের সবচেয়ে অনন্য স্টেডিয়াম; মাটির ৩৫০ মিটার ওপরে অবস্থিত মাঠ, মনোমুগ্ধকর দৃশ্য এবং শহরের কাঠামোর অংশ হিসেবে নির্মিত ছাদসহ এই স্টেডিয়াম ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা তৈরি করবে।”
এই নিওম স্টেডিয়াম ৪৬ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতা সম্পন্ন হবে বলে ধারণা দেওয়া হয়েছে। শুধু ফুটবল খেলা নয়, এখানে থাকবে বহুমাত্রিক বিনোদন, প্রযুক্তিনির্ভর অভিজ্ঞতা এবং পরিবেশবান্ধব নির্মাণ কৌশল।
ফুটবলকে আকাশে স্থাপন করা নিঃসন্দেহে এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। অনেকেই বলছেন, এটি কেবল একটি স্টেডিয়াম নয়—এটি ভবিষ্যতের মানব কল্পনা ও প্রযুক্তির সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতীক।
????️ ‘দ্য লাইন’: যেখানে ভবিষ্যতের শহরে ফুটবে ফুটবল
‘দ্য লাইন’ শহরটি ঘোষণা করা হয় ২০২১ সালে। এটি এক অভূতপূর্ব স্মার্ট সিটি, যা ১৭০ কিলোমিটার লম্বা, ২০০ মিটার চওড়া এবং সর্বাধিক ৫০০ মিটার উঁচু একটি সরল ভবননগরী হিসেবে পরিকল্পিত। এই শহরে থাকবে না কোনো গাড়ি, রাস্তা বা কার্বন নিঃসরণ।
পরিকল্পনা অনুযায়ী নয় মিলিয়ন মানুষের বসবাস হবে এই শহরে—যা সৌদি আরবের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ। এখানকার চলাচল হবে স্বয়ংক্রিয় ট্রানজিট সিস্টেমে, পরিবেশ থাকবে সম্পূর্ণ টেকসই।
তবে ‘দ্য লাইন’-এর মূল নকশায় এখনো নিওম স্টেডিয়ামের উপস্থিতি আনুষ্ঠানিকভাবে দেখা যায়নি, ফলে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, এটি আদৌ সরকারি পরিকল্পনার অংশ কিনা। তবুও ধারণাটি এতটাই ব্যতিক্রমী যে বিশ্বজুড়ে ক্রীড়াপ্রেমীরা একে ভবিষ্যতের দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন।
???? বিশ্বকাপ আয়োজন: সৌদির জন্য এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ
২০২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর ফিফার বিশেষ কংগ্রেসে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়—২০৩৪ সালের বিশ্বকাপ আয়োজন করবে সৌদি আরব। রোটেশন নীতির কারণে শুধু এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চল থেকেই বিড গ্রহণ করা হয়েছিল, আর মাত্র ২৫ দিনের মধ্যে আগ্রহ প্রকাশ করতে বলা হয়।
অবশেষে সৌদি আরবই একমাত্র দেশ হিসেবে বিড করে আয়োজক হওয়ার সম্মান অর্জন করে। ফলে এটি হবে এশিয়ায় তৃতীয় এবং সৌদি আরবে প্রথম একক বিশ্বকাপ।
রিয়াদ, জেদ্দা, আল খোবার, আবহা এবং নিওম—এই পাঁচটি শহরে থাকবে প্রধান স্টেডিয়ামগুলো। প্রতিটি ভেন্যুতে থাকবে আলাদা থিম, যেমন ক্রিস্টালের মতো স্থাপত্য বা স্থানীয় উপকরণে তৈরি অনন্য নির্মাণশৈলী।
????️ ভবিষ্যতের ফুটবলের মানবিক দিক
ফুটবল শুধু খেলা নয়—এটি সংস্কৃতি, সংহতি ও মানবিকতার প্রতীক। নিওমের এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা হয়তো অনেকের কাছে বিলাসী মনে হতে পারে, কিন্তু এর মধ্যে আছে একটি গভীর বার্তা—মানুষের স্বপ্ন, প্রযুক্তি এবং ক্রীড়ার মিলনে কীভাবে টেকসই ভবিষ্যৎ গড়া যায়।
যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তবে নিওম স্টেডিয়াম হবে মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক—যেখানে মাটি নয়, আকাশই হবে মাঠ।
???? সৌদি স্বপ্নের পথচলা
২০৩৪ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনে সৌদি আরবের হাতে এখনো এক দশকেরও বেশি সময় আছে। তবে ইতোমধ্যেই বিশ্বকাপ–পূর্ব অবকাঠামো উন্নয়ন ও ক্রীড়াবান্ধব নীতি প্রণয়ন শুরু হয়ে গেছে।
বিশ্বের চোখ এখন যদিও ২০২৬ সালের উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপের দিকে—যেখানে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দেশ অংশ নেবে, এবং সম্ভবত এটিই হবে রোনালদো ও মেসির শেষ আসর। কিন্তু নিওমের স্বপ্ন ইতোমধ্যেই আগামী প্রজন্মের ফুটবলকে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।