• হোম > রাজনীতি > নির্বাচনে সেনাবাহিনীর বিচারিক ক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক

নির্বাচনে সেনাবাহিনীর বিচারিক ক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক

  • সোমবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৫, ১১:০৫
  • ৫৩

---

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এবার প্রায় এক লাখেরও বেশি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ লক্ষ্যে নির্বাচনী আইনে সংশোধন এনে সেনাবাহিনীসহ তিন বাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞায় যুক্ত করা হয়েছে।

ফলে প্রথমবারের মতো সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরাও পুলিশের মতো ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। তবে নির্বাচনকালীন সময়ে তাদের বিচারিক ক্ষমতা বা ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দেওয়ার প্রশ্নে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

ইসির ব্যাখ্যায় বলা হচ্ছে, সেনাবাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় যুক্ত করা হলেও বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার এখতিয়ার শুধুমাত্র সরকারের হাতে। ফলে নির্বাচনের সময় সেনাবাহিনীকে ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ হিসেবে, অর্থাৎ বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তাকারী বাহিনী হিসেবেই মাঠে নামানো হবে।

গত সপ্তাহে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এক বৈঠকে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে নির্বাচনকালীন বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার দাবি জানানো হয়। তাদের যুক্তি, গত বছরের সেপ্টেম্বরে সরকার সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে মাঠে নামিয়েছে, যা এখনো বহাল আছে। তাহলে নির্বাচনের সময় সেই ক্ষমতা কেন থাকবে না—এই প্রশ্ন তুলেছেন বাহিনীর কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর হাতে বিচারিক ক্ষমতা নতুন কিছু নয়। ২০০২ সালের ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ থেকে শুরু করে ২০০৭ সালের ওয়ান ইলেভেনের সময় পর্যন্ত বিভিন্ন পরিস্থিতিতে এই ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়েছে। তখন সেনা সদস্যরা অভিযান, তল্লাশি, আটক ও সংক্ষিপ্ত সাজা দেওয়ার ক্ষমতা পেয়েছিলেন।

তবে এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। নির্বাচন কমিশন বলছে, তাদের আইনি কাঠামো অনুযায়ী এখন ইসির পক্ষে একতরফাভাবে এই ক্ষমতা দেওয়ার সুযোগ নেই। ইসি সচিব আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন,

“আইন অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দেওয়ার ক্ষমতা এখন সরকারের হাতে। নির্বাচন কমিশন কেবল আইন প্রয়োগকারী বাহিনী হিসেবে তাদের নিয়োগ দিতে পারে।”


বিচারিক ক্ষমতা কী ও কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার মানে হলো—দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা বা বাহিনীর সদস্য অপরাধ সংঘটিত হলে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেফতার, সংক্ষিপ্ত বিচার ও সাজা দিতে পারেন। এমনকি প্রয়োজনে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুলি চালানোর আদেশও দিতে পারেন।

আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন,

“যখন সেনাবাহিনীর হাতে বিচারিক ক্ষমতা থাকে, তখন তারা স্থানীয় প্রশাসনের জন্য অপেক্ষা না করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু সেই ক্ষমতা না থাকলে তাদের অনেক ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করতে হয়।”

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন,

“এক বছরেরও বেশি সময় ধরে সেনাবাহিনী বিচারিক ক্ষমতা নিয়ে মাঠে আছে। শুধু ভোটের সময় সেই ক্ষমতা না থাকলে সুষ্ঠু নির্বাচনে সমস্যা হতে পারে।”


নির্বাচন কমিশনের অবস্থান

ইসির মতে, সেনাবাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় যুক্ত করা হলেও তাদের বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়টি সরকারের অনুমোদনের ওপর নির্ভর করছে। তারা শুধুমাত্র সিভিল প্রশাসনের সহায়ক বাহিনী হিসেবেই মোতায়েন থাকবে।

ইসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান,

“আমরা আইনি কাঠামো অনুযায়ী সেনাবাহিনীকে যুক্ত করেছি। কিন্তু তাদের বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার এখতিয়ার আমাদের নেই। এটি একান্তই সরকারের বিষয়।”


বিশেষজ্ঞদের মত

নির্বাচন বিশ্লেষক জেসমিন টুলী মনে করেন,

“আগে সেনাবাহিনীর নাম আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় ছিল না। এখন যুক্ত করা হয়েছে, যা ইতিবাচক। তবে যদি পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়, তখন সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।”

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন,

“নির্বাচন যদি প্রতিযোগিতাপূর্ণ ও শান্তিপূর্ণ হয়, তাহলে আগে থেকেই বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার যৌক্তিকতা নেই। এটি অনেকটা ঢালাও কর্তৃত্ব চাওয়ার মতো। পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।”


উপসংহার

বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে সেনাবাহিনী আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া হবে কি না, তা এখনো সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ, আলোচনা ও বিতর্ক চলছেই।

দেশের মানুষ এখন অপেক্ষায়—আগামী নির্বাচন যেন শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক ও স্বচ্ছভাবে অনুষ্ঠিত হয়।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/5951 ,   Print Date & Time: Wednesday, 4 February 2026, 07:48:20 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh