যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন যে কানাডার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের বাণিজ্য আলোচনা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা হয়েছে।
স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) রাতে নিজের সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন,
“তাদের আচরণের কারণে কানাডার সঙ্গে সব বাণিজ্য আলোচনা এখানেই বাতিল ঘোষণা করা হলো।”
ট্রাম্প অভিযোগ করেন, কানাডা একটি ‘প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন’ প্রচার করেছে, যেখানে প্রয়াত মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগানকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত
ঘটনার সূত্রপাত হয় কানাডার অন্টারিও প্রদেশে তৈরি এক বিজ্ঞাপনকে কেন্দ্র করে।
বিজ্ঞাপনটিতে দেখা যায়, সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগান নাকি শুল্কনীতির বিরুদ্ধে কথা বলছেন—যেন বিদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করলে তা চাকরি হারানো ও বাণিজ্য যুদ্ধের কারণ হতে পারে।
অন্টারিও প্রদেশের প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন,
“আমি শুনেছি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমাদের বিজ্ঞাপনটি দেখেছেন। নিশ্চিতভাবে তিনি এতে খুশি নন।”
এই বিজ্ঞাপনটি ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক শুল্ক নীতির সমালোচনামূলক ইঙ্গিতবাহী বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রেগান ফাউন্ডেশনের প্রতিক্রিয়া
বৃহস্পতিবার রাতেই রোনাল্ড রেগান প্রেসিডেন্সিয়াল ফাউন্ডেশন এক বিবৃতিতে জানায়,
“অন্টারিও সরকারের বিজ্ঞাপনটি ১৯৮৭ সালের প্রেসিডেন্ট রেগানের রেডিও ভাষণের অংশ বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছে। এটি মূল বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা।”
ফাউন্ডেশন আরও জানায়, অন্টারিও সরকার কোনো অনুমতি ছাড়াই রেগানের বক্তব্য সম্পাদনা ও ব্যবহার করেছে, যা কপিরাইট ও নৈতিকতার পরিপন্থী। তারা এ বিষয়ে আইনি পদক্ষেপের কথাও বিবেচনা করছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্য নীতি
ট্রাম্পের মেয়াদকালে বাণিজ্যনীতি সবসময়ই ছিল আক্রমণাত্মক।
বিশেষ করে তিনি স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম ও গাড়ির ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সম্পর্ককে বেশ কয়েকটি মিত্রদেশের সঙ্গে উত্তপ্ত করে তোলে।
কানাডা পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় নিজ দেশের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর প্রতিশোধমূলক শুল্ক আরোপ করে।
এরপর থেকে দুই দেশের মধ্যে একাধিক আলোচনার মাধ্যমে একটি নতুন বাণিজ্য চুক্তির চেষ্টা চলছিল, কিন্তু বৃহস্পতিবারের ঘোষণার পর সেই আলোচনার ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ট্রাম্পের শুল্ক নীতি ১৯৩০-এর দশকের পর যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে উচ্চ শুল্কহার তৈরি করেছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় অস্থিরতা বাড়াচ্ছে।
কানাডার প্রতিক্রিয়া ও সতর্কবার্তা
অন্যদিকে, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন,
“যদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য আলোচনায় কোনো অগ্রগতি না হয়, তবে আমরাও তাদের বাজারে প্রবেশাধিকার সীমিত করতে বাধ্য হব।”
তিনি আরও জানান, আগামী বছর যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো একসঙ্গে ২০২০ সালে স্বাক্ষরিত মহাদেশীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (USMCA) পুনর্বিবেচনা করবে।
এই পরিস্থিতিতে দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক নতুন করে উত্তেজনার মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
বিশ্লেষণ: নতুন বাণিজ্য সংঘাতের ইঙ্গিত
আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদদের মতে, ট্রাম্পের এই ঘোষণা শুধুমাত্র কানাডা নয়, সমগ্র উত্তর আমেরিকার বাণিজ্য স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় ধাক্কা।
দুই দেশই পরস্পরের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার, এবং এই সম্পর্কের অবনতি হলে তা উভয় দেশের শিল্প, কৃষি ও জ্বালানি খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
একজন অর্থনীতি বিশ্লেষক বলেন,
“বাণিজ্য যুদ্ধ কোনো দেশের একার ক্ষতি নয়; বরং এর প্রভাব পড়ে পুরো আঞ্চলিক অর্থনীতিতে। কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের এই ঠান্ডা যুদ্ধ আবারও বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করবে।”
উপসংহার
ট্রাম্পের এই আকস্মিক ঘোষণা আবারও প্রমাণ করছে যে, রাজনীতি ও বাণিজ্যের সীমারেখা আজকাল ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে পড়ছে।
জাতীয় স্বার্থ রক্ষার নামে নেওয়া প্রতিটি কঠোর সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত মানবজীবন, কর্মসংস্থান ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক তাই কেবল দুই দেশের নয়—বরং গোটা উত্তর আমেরিকার অর্থনৈতিক ভবিষ্যতেরও পরীক্ষাক্ষেত্র হয়ে উঠছে।