বাংলাদেশে বহুজাতিক কোম্পানি বাটা শু-এর ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায় সূচিত হতে যাচ্ছে। ৬৩ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন নারী প্রতিষ্ঠানটির সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে আসীন হচ্ছেন। তিনি হলেন ফারিয়া ইয়াসমিন—বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বাটার প্রথম বাংলাদেশি ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)।
কোম্পানির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, আগামী মাসে ফারিয়া ইয়াসমিন আনুষ্ঠানিকভাবে এমডির দায়িত্ব নেবেন। তিনি বর্তমান এমডি দেবব্রত মুখার্জির স্থলাভিষিক্ত হবেন। দেবব্রত মুখার্জি আগামী ২০ নভেম্বর পদত্যাগ করে ভারতের একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে এমডি হিসেবে যোগ দেবেন।
বাটার ইতিহাসে নতুন দিগন্ত
১৯৬২ সালে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) কার্যক্রম শুরু করে বাটা শু। স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠানটি তার ব্যবসা সম্প্রসারণ করে এবং ১৯৮৫ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। বর্তমানে কোম্পানিটির টঙ্গী ও ধামরাইয়ে দুটি আধুনিক কারখানা রয়েছে, যেগুলোতে প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার জোড়া জুতা উৎপাদিত হয়। বছরে গড়ে ৩ কোটি জোড়া জুতা বিক্রি করে বাটা, যা দেশের জুতাশিল্পে এক বড় অংশীদারিত্ব বজায় রাখে।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি–জুন) কোম্পানিটি ৫১৭ কোটি টাকার ব্যবসা করেছে এবং ২৭ কোটি টাকার বেশি মুনাফা অর্জন করেছে। ২০২৪ সালের শেষে বাটার মালিকানা কাঠামো অনুযায়ী,
-
৭০% শেয়ার রয়েছে বিদেশি উদ্যোক্তাদের হাতে,
-
১৯.৪৭% প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে,
-
৯.২৩% সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে এবং
-
১.৩০% বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে।
ফারিয়া ইয়াসমিন: অভিজ্ঞতার দুই দশক
ফারিয়া ইয়াসমিনের রয়েছে ২৩ বছরের অভিজ্ঞতা ব্র্যান্ড মার্কেটিং, পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্ট ও ব্যবসা পরিচালনায়। তিনি বাংলাদেশের পাশাপাশি শ্রীলঙ্কায়ও বিভিন্ন নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকায় কাজ করেছেন।
বাটা শুর এমডি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আগে তিনি দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী এসিআই লিমিটেডের প্রধান ব্যবসায় কর্মকর্তা (চিফ বিজনেস অফিসার) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া রেকিট বেনকিজার, ম্যারিকো এবং নেসলের মতো বিশ্বখ্যাত বহুজাতিক কোম্পানিতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন।
বাটা সূত্রে জানা গেছে, স্বাধীনতার আগে এক বাংলাদেশি কোম্পানিটির শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তবে তখন সে পদটি “এমডি” হিসেবে স্বীকৃত ছিল না। তাই ফারিয়া ইয়াসমিন হচ্ছেন স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম বাংলাদেশি এমডি এবং একই সঙ্গে প্রথম নারী এমডি।
নারী নেতৃত্বে নতুন অনুপ্রেরণা
করপোরেট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই নিয়োগ বাংলাদেশের করপোরেট খাতে নারী নেতৃত্বের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
ব্যবসা বিশ্লেষক আনিসুজ্জামান খান বলেন,
“বাটা শুর মতো ঐতিহ্যবাহী বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে একজন বাংলাদেশি নারীর এমডি হওয়া দেশের নারী নেতৃত্ব ও করপোরেট সংস্কৃতির জন্য এক ঐতিহাসিক মাইলফলক।”
অন্যদিকে বাটার এক কর্মকর্তার ভাষায়,
“ফারিয়া ইয়াসমিনের নেতৃত্বে কোম্পানিটি নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাবে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস। তিনি আমাদের ভবিষ্যতের রোল মডেল।”
মানবিক দৃষ্টিকোণ
ফারিয়া ইয়াসমিনের নিয়োগ কেবল করপোরেট উন্নয়নের গল্প নয়—এটি বাংলাদেশের নারী পেশাজীবীদের জন্যও এক আশার বার্তা। এক সময় যেখানে শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্ব পুরুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, সেখানে একজন নারীর দৃঢ় পরিশ্রম, মেধা ও নেতৃত্ব এখন নতুন ইতিহাস লিখছে।