বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনে বাঁশ শিল্প ছিল একসময়ের অমূল্য ঐতিহ্য। বিশেষ করে রংপুর বিভাগের গঙ্গাচড়া, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, নীলফামারী এবং অন্যান্য উত্তরের জেলা গ্রামগুলোতে বাঁশ শিল্প ছিল মানুষের একমাত্র জীবিকা। একসময় বাঁশ কাটার শব্দে গ্রামবাংলা মুখর থাকত। বাঁশ দিয়ে তৈরি হস্তশিল্প, যেমন ডালি, কুলা, ঝুড়ি, চাটাই, হাঁস-মুরগির টোপা, মাছ ধরার ফাঁদ, হাতপাখা, এসব ছিল গ্রামীণ জীবনের অঙ্গ।
কিন্তু সময়ের পরিবর্তন, আধুনিক প্রযুক্তি, নগরায়ন এবং ডিজিটাল যুগের আগমনে এই ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। এক সময় যেসব পরিবার বাঁশ শিল্পে জীবিকা নির্বাহ করত, এখন সেই সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে গেছে। রংপুরের গঙ্গাচড়ার মনিরাম গ্রামে বাঁশ শিল্পে কর্মরত মানুষের সংখ্যা এখন ১২ হাজার, যেখানে একসময় এই শিল্পে ৭০ হাজার পরিবার জীবিকা নির্বাহ করত।
বাঁশের দাম বৃদ্ধি, বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া, সরকারি সহায়তার অভাব এবং গ্রামীণ এলাকার বাঁশবন উজাড় হওয়া—এই সব কারণে বাঁশ শিল্পে কর্মরত মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে। বাঁশের দাম ৫০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে থাকলেও বর্তমানে তা ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় পৌঁছে গেছে, যা শিল্পীদের জন্য অত্যন্ত চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে বাড়তি খরচ, অন্যদিকে কম চাহিদার কারণে তারা বেচাবিক্রি করতে পারছেন না। এই অবস্থায় বাঁশশিল্পীরা পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন, কেউ রিকশা চালাচ্ছেন, কেউ দিনমজুরি করছেন।
তবে এই শিল্পকে বাঁচানোর জন্য সরকার কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) বলছে, তারা এই শিল্পের উন্নয়নে ঋণ ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য কাজ করছে। তবে স্থানীয় পর্যায়ে শিল্পীদের জন্য আর্থিক সহায়তা ও বাজারের প্রসার খুবই প্রয়োজন। এর জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং আধুনিক ডিজাইন ও অনলাইন বিপণন প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত করা হলে বাঁশ শিল্প আবারও নতুন জীবন পেতে পারে।
বাংলাদেশের বাঁশ শিল্প শুধু একটি পেশা নয়, এটি একটি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই শিল্প। এটি গ্রামীণ জীবনযাত্রার অঙ্গ, যা দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। যদি বাঁশ শিল্পের প্রতি সরকারি সহায়তা ও ভালো পরিকল্পনা প্রদান করা হয়, তাহলে এই হারানো ঐতিহ্য ফিরে আসতে পারে এবং এটি পুনরায় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করতে সক্ষম হবে।