![]()
ইবি রিপোর্ট
জমির শেয়ার বিক্রি করে নির্দিষ্ট আয়তনের ফ্ল্যাট দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে চলা অনিয়ন্ত্রিত আবাসন ব্যবসা বন্ধের দাবি জানিয়েছে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)। সংগঠনটির দাবি, এ ধরনের ব্যবসায়িক মডেলে প্রায় ৪০ হাজার নাগরিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
রোববার (৮ নভেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন রিহ্যাবের প্রেসিডেন্ট ড. আলী আফজাল। তাঁর আশঙ্কা, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে আগামী দুই থেকে তিন বছরে মামলা ও আইনি জটিলতায় প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা আটকে যেতে পারে।
রিহ্যাবের অভিযোগ, জমির মালিকানা, প্রকল্পের অনুমোদন, নির্মাণসক্ষমতা ও অর্থের ব্যবহারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করেই বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এই ব্যবসা চালাচ্ছে। এতে ক্রেতারা প্রতারণা, আর্থিক ক্ষতি ও আইনি জটিলতার ঝুঁকিতে পড়ছেন।
সংগঠনটি একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জমির শেয়ারভিত্তিক প্রকল্পে প্রতারণার অভিযোগে ৯ হাজার ৮২৩টি মামলা বিচারাধীন। এসব মামলায় প্রায় ৪০ হাজার ক্রেতা এবং প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা জড়িত। রিহ্যাবের মতে, এই পরিসংখ্যান ক্রেতাসুরক্ষা ও কার্যকর নজরদারির অভাব দেখিয়ে দিচ্ছে।
রিহ্যাব জানায়, এই মডেলে জমির একটি অংশ বিক্রি করে ভবিষ্যতে ফ্ল্যাট নির্মাণ ও হস্তান্তরের কথা দেওয়া হয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে জমির প্রকৃত মালিকানা, অনুমোদিত নকশা, নির্মাণের আইনগত অধিকার, অর্থের ব্যবহার ও ফ্ল্যাটের নির্দিষ্ট অবস্থান ক্রেতাকে স্পষ্টভাবে জানানো হয় না। ফলে টাকা দেওয়ার পরও সময়মতো ফ্ল্যাট, বৈধ মালিকানা বা অর্থ ফেরতের নিশ্চয়তা মেলে না।
সংগঠনটির মতে, জমির শেয়ার কিনলেই নির্দিষ্ট ফ্ল্যাটের আইনগত মালিকানা নিশ্চিত হয় না। একই জমি বা ভবনের বিপরীতে একাধিক ব্যক্তির কাছে শেয়ার বিক্রির অভিযোগও আছে। অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ অনুমোদন ও নকশা ছাড়াই অর্থ তোলা হচ্ছে। দক্ষ প্রকৌশলী, স্থপতি ও পেশাদার তদারকির অভাবে ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা ও নির্মাণমানও ঝুঁকিতে পড়ছে।
জমির মূল্য, শেয়ার বিক্রি, অর্থ সংগ্রহ ও নির্মাণ ব্যয়ের হিসাব অনেক সময় স্বচ্ছ নয় বলেও সংগঠনটি জানায়। তাই আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), নিবন্ধন ফিসহ সরকারি রাজস্ব ঠিকমতো আদায় হচ্ছে কি না, সে প্রশ্নও উঠছে। অন্যদিকে আইন মেনে চলা প্রতিষ্ঠানগুলোকে জমি কেনা, অনুমোদন, নির্মাণমান, নিরাপত্তা, কর ও ভ্যাটের বাধ্যবাধকতা পূরণ করতে হয়। এসব না মেনে কম দামে ফ্ল্যাটের প্রতিশ্রুতিতে অর্থ তোলায় বৈধ প্রতিষ্ঠানগুলো অসম প্রতিযোগিতায় পড়ছে।
আলী আফজাল দাবি করেন, এই মডেলে নির্মাণাধীন ১০০টি ভবন পরিদর্শন করলে প্রায় প্রতিটিতেই কোনো না কোনো অনিয়ম মিলবে। অনুমোদিত নকশার সঙ্গে বাস্তব নির্মাণের অমিল এবং ভবনের অনুমোদিত ব্যবহার ও নির্মাণশর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগও রয়েছে। তাই নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এসব ভবনের স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কারিগরি যাচাই চায় রিহ্যাব।
শেয়ারভিত্তিক মালিকানায় অংশীদারদের মধ্যে বিরোধ হলে নির্মাণ, ফ্ল্যাট বরাদ্দ, দখল, দলিল নিবন্ধন ও ভবন রক্ষণাবেক্ষণ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ভবিষ্যতে জমি বা ফ্ল্যাট বিক্রি, ব্যাংকে বন্ধক এবং উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনেও জটিলতা তৈরি হতে পারে। রিহ্যাব মনে করে, এসব বিরোধ দীর্ঘ মামলা, আর্থিক সংকট, পারিবারিক বিরোধ ও সামাজিক অস্থিরতা ডেকে আনতে পারে।
সরকারের কাছে ছয় দফা দাবি
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটি সরকারের কাছে ছয় দফা দাবি জানায়:
- জমির শেয়ার বিক্রি করে নির্দিষ্ট ফ্ল্যাট দেওয়ার প্রতিশ্রুতিনির্ভর অনিয়ন্ত্রিত মডেল বন্ধ করা অথবা কঠোর নিয়ন্ত্রণে আনা
- জমির মালিকানা, নিবন্ধন, দায়-দেনা, অনুমোদিত নকশা ও নির্মাণের আইনগত অধিকার নিশ্চিত না করে অর্থ সংগ্রহ বন্ধ করা
- বিদ্যমান শেয়ারভিত্তিক প্রকল্পের স্বাধীন কারিগরি ও আইনগত নিরীক্ষা করা
- একই জমি একাধিকবার বিক্রি, জাল দলিল, ভুয়া অনুমোদন, অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার অভিযোগ তদন্ত করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া
- প্রতিটি প্রকল্পের জমি কেনা, অর্থ সংগ্রহ, নির্মাণ ব্যয় ও অগ্রগতির স্বচ্ছ ও নিরীক্ষাযোগ্য হিসাব নিশ্চিত করা
- যোগ্য স্থপতি, প্রকৌশলী ও পেশাদার জনবল নিয়োগ দিয়ে নির্মাণের প্রতিটি পর্যায়ে মান ও নিরাপত্তা তদারকি করা
রিহ্যাবের প্রেসিডেন্ট বলেন, জমির যৌথ মালিকানা বা বৈধ বিনিয়োগের বিরুদ্ধে তাঁরা নন। তবে অংশীদারত্ব বা যৌথ উদ্যোগের নামে এমন ব্যবসা গ্রহণযোগ্য নয়, যেখানে বিনিয়োগের বিপরীতে ফ্ল্যাটের মালিকানা ও হস্তান্তরের কার্যকর নিশ্চয়তা নেই। যেসব প্রকল্পে মালিকানা, নির্মাণের দায়, বিনিয়োগের নিরাপত্তা ও চূড়ান্ত হস্তান্তরের নিশ্চয়তা নেই, আইনগত পর্যালোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেগুলোর নতুন বিক্রয় ও অর্থ সংগ্রহ বন্ধ রাখার আহ্বানও জানিয়েছে রিহ্যাব।
সংগঠনটির ভাষ্য, আবাসন খাত অর্থনীতি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রাজস্বের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এ খাতের সঙ্গে তিন শতাধিক সংযোগ শিল্প জড়িত। পুরো নির্মাণ খাত জিডিপির প্রায় ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ অবদান রাখে এবং প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এর সঙ্গে যুক্ত।
রিহ্যাবের মতে, এটি শুধু কোনো ব্যবসায়ী সংগঠনের বিষয় নয়, জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন। এর সঙ্গে মানুষের সারা জীবনের সঞ্চয়, আবাসনের নিরাপত্তা, সরকারি রাজস্ব ও দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ জড়িত। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আর্থিক, সামাজিক ও আইনি ক্ষতির বোঝা রাষ্ট্রকেই বইতে হতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও ছিলেন সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুর রাজ্জাক, ভাইস প্রেসিডেন্ট-১ মোহাম্মদ আক্তার বিশ্বাস, ভাইস প্রেসিডেন্ট-২ আবু খালিদ মো. বরকত উল্লাহ, ভাইস প্রেসিডেন্ট-৩ এ এফ এম ওবায়দুল্লাহ এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট (ফিন্যান্স) ড. মো. হারুন অর রশিদ।