![]()
ইবি রিপোর্ট
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ফল রপ্তানি থেকে বাংলাদেশের আয় ৭৬ শতাংশ কমেছে। পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক মান পরিপালনে দীর্ঘদিনের ঘাটতি রপ্তানিকারকদের পথ আটকে দিয়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-সেপ্টেম্বরে ফল রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৭৩ লাখ ৮০ হাজার ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ৩ কোটি ৮ লাখ ৬০ হাজার ডলার। উৎপত্তি ও সরবরাহব্যবস্থা শনাক্তের সক্ষমতা, সংগ্রহ-পরবর্তী অবকাঠামো এবং সংগনিরোধ (কোয়ারেন্টাইন) মানেও ঘাটতি রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইংয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, হরমুজ প্রণালি ঘিরে সৃষ্ট সংকটে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে ফল রপ্তানির পরিমাণেও।
ইইউ, যুক্তরাজ্য এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যে প্রধান রপ্তানি পণ্য আম ও কাঁঠাল। রপ্তানিকারক ও বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হাফিজুর রহমান বলেন, পরিবহন ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় এসব বাজারে রপ্তানি কঠিন হয়ে পড়ছে।
অ্যালেক্সা ট্রেডিং করপোরেশনের পরিচালক অনুপ দাস জানান, পরিবহন খরচ ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ ডলার থেকে বেড়ে ৭ হাজার থেকে ৮ হাজার ডলারে উঠেছে। আকাশপথেও স্বস্তি নেই। কার্গোর জায়গা সীমিত, ফ্লাইটের সময়সূচিও অনিয়মিত। এ কারণে ওমানে ডাব এবং মালদ্বীপে বাঁধাকপির চালান আটকে আছে।
হিমাগার, প্রক্রিয়াকরণ ও শোধন সুবিধা, পরীক্ষাগার, প্যাকেজিং ব্যবস্থা এবং খামার পর্যায়ে তথ্য সংরক্ষণের ঘাটতিও রপ্তানি প্রবৃদ্ধির পথে বাধা।
ট্রেসেবিলিটি ও হিমায়ন ব্যবস্থার ঘাটতি
হাফিজুর রহমানের মতে, ট্রেসেবিলিটি শর্ত নিয়ে সচেতনতার অভাব এবং চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদের ঘাটতিতে আন্তর্জাতিক মান পূরণ কঠিন হচ্ছে। বিমানবন্দরের কাছে পর্যাপ্ত সংগ্রহকেন্দ্র ও প্যাকিং হাউস না থাকায় রপ্তানির আগে ফলমূল ও সবজি সতেজ রাখাও কঠিন।
হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক মো. মাহবুবুল আলম শাকিব বলেন, “কৃষকেরা প্রায়ই কীটনাশক ও সার ব্যবহারের তথ্য সংরক্ষণ করেন না। ফলে রপ্তানিযোগ্য ফলে নির্ধারিত মাত্রার বেশি কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেলে তার উৎস শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।” সমাধানে চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ বাড়ানো এবং রাসায়নিক ব্যবহারের তথ্য রাখতে বাংলাভাষায় সহজ ডিজিটাল ব্যবস্থার পরামর্শ দেন তিনি।
তাঁর মতে, উৎপাদনস্থল থেকে রপ্তানি কেন্দ্র পর্যন্ত কার্যকর কোল্ড চেইন না থাকায় ফলমূল ও সবজি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। ঢাকার শ্যামপুরের কেন্দ্রীয় প্যাকিং হাউসে পরিবহনের সময় পণ্যের মান নষ্ট হতে পারে। তাই রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের কাছাকাছি প্যাকিং হাউস ও শোধনকেন্দ্র স্থাপনের পরামর্শ দেন তিনি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, রপ্তানির শর্ত পূরণে কৃষকদের সহায়তা করা হচ্ছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদে যুক্ত কৃষকদের ট্রেসেবিলিটি সনদ দিচ্ছেন। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা চাষাবাদ পদ্ধতি তদারকি করছেন। কৃষকদের কীটনাশক প্রয়োগ ও ফসল সংগ্রহের মধ্যে নির্ধারিত বিরতিও মানতে হচ্ছে।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, পরিবহনে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ভ্যান ব্যবহার হচ্ছে। আমের মতো দ্রুত পচনশীল পণ্যের জন্য বিমানবন্দরে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত স্বল্পমেয়াদি সংরক্ষণব্যবস্থার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে সরকার। দেশজুড়ে কয়েক হাজার ক্ষুদ্র হিমাগার হলে ফসল সংগ্রহ-পরবর্তী অপচয়ও কমতে পারে।
শোধন, পরীক্ষা ও প্যাকেজিংয়ে বাড়তি ব্যয়
আমদানিকারক দেশের উদ্ভিদ স্বাস্থ্যসংক্রান্ত শর্ত পূরণ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ, বিশেষ করে নতুন বাজারে ঢুকতে চাওয়া রপ্তানিকারকদের জন্য। হাফিজুর রহমান বলেন, প্রধান বাজারে প্রবেশে ভেপার হিট ট্রিটমেন্ট (ভিএইচটি) ও হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট (এইচডব্লিউটি) জরুরি। কিন্তু এ ধরনের শোধনকেন্দ্র আরও বাড়াতে হবে। মাহবুবুল আলমও শোধনকেন্দ্রের ঘাটতিকে নতুন বাজারে প্রবেশের অন্যতম বাধা বলেছেন।
অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে উদ্বোধন করা গাবতলীর ভিএইচটি কেন্দ্রে ফল শোধন ও সংগনিরোধসহ নানা সেবা দেওয়া হচ্ছে। বিমানবন্দরে পাঠানোর আগে একই জায়গায় শোধন, প্যাকেজিং ও সংগনিরোধ ছাড়পত্রের ওয়ান-স্টপ সেবার ঘোষণাও এসেছে।
পরীক্ষা ও প্যাকেজিংয়ের উচ্চ ব্যয় রপ্তানিকারকদের জন্য বাড়তি চাপ। হাফিজুর রহমান বলেন, “পর্যাপ্ত পরীক্ষাগারের অভাব ও পরীক্ষার উচ্চ ব্যয়ের কারণে আন্তর্জাতিক মান পরিপালন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এ ছাড়া কার্টন তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চ শুল্কের কারণে প্যাকেজিং খরচও বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে দেশেই প্যাকেজিং উপকরণ উৎপাদনে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন।”
তিনি আরও বলেন, “আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো এবং বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা অর্জনে মান নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার পাশাপাশি রপ্তানি অবকাঠামোয় ধারাবাহিক বিনিয়োগ জরুরি।”
ফল উৎপাদন কেবল প্রথম ধাপ। ধারাবাহিক রপ্তানি আয়ের জন্য নির্ভরযোগ্য পরিবহন, যথাযথ সংরক্ষণ সুবিধা, পর্যাপ্ত শোধনকেন্দ্র এবং সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য পরীক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।