![]()
ইবি রিপোর্ট
চাকরির সাক্ষাৎকারের আমন্ত্রণ, এরপর ম্যালওয়্যার ডাউনলোড—এভাবেই বড় সাইবার হামলার শিকার হয়েছে বাইন্যান্স। বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে চুরি হয়েছে ৬৩০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো সম্পদ। প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, প্রকৌশলীদের লক্ষ্য করে পরিকল্পিত প্রতারণার মাধ্যমে হ্যাকাররা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থায় প্রবেশ করে। এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গ্রাহকদের লেনদেন ও উত্তোলন কার্যক্রম।
বাইন্যান্সের প্রকাশিত প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে হামলার কৌশল সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়েছে। সেখানে বলা হয়, হ্যাকাররা কয়েকটি ধাপে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করে। প্রকৌশলীদের কম্পিউটারে ক্ষতিকারক সফটওয়্যার প্রবেশ করিয়ে তারা প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এর মাধ্যমে ওয়ালেট থেকে বিপুল পরিমাণ ক্রিপ্টোকারেন্সি সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
বাইন্যান্স ঘটনাটিকে জটিল নিরাপত্তা সংকট হিসেবে উল্লেখ করেছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবহারকারীদের কাছে ক্ষমা চেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া বিবৃতিতে হামলার পদ্ধতিও তুলে ধরেছে তারা।
প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, হ্যাকাররা সামাজিক প্রকৌশল কৌশল ব্যবহার করে প্রকৌশলীদের লক্ষ্যবস্তু বানায়। প্রথমে বৈধ চাকরি খোঁজার একটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে একজন প্রকৌশলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরে ভুয়া কোম্পানির প্রতিনিধির পরিচয়ে তাকে সাক্ষাৎকারের আমন্ত্রণ জানানো হয়।
সাক্ষাৎকারের আড়ালে ম্যালওয়্যার ছড়ানোর কৌশল
হ্যাকাররা নিজেদের বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া অ্যাকাউন্ট তৈরি করে। এসব অ্যাকাউন্ট থেকে ব্যক্তিগত ছবি শেয়ার করে প্রতারণার বিষয়টি আড়াল রাখা হয়। দ্বিতীয় সাক্ষাৎকারের সময় প্রকৌশলীকে একটি অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হয়। সেই কাজের অংশ হিসেবে তাকে ক্ষতিকারক সফটওয়্যার ডাউনলোড করতে বলা হয়।
সফটওয়্যারটির ভেতরে গোপনে ক্ষতিকারক কোড রাখা হয়েছিল। ফলে প্রচলিত শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এড়িয়ে সেটি কম্পিউটারে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়। এভাবে প্রকৌশলীর কম্পিউটারের নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যায় হ্যাকাররা।
পরবর্তী সময়ে অক্টোবর মাসে হামলার পরিধি আরও বাড়ানো হয়। ক্ষতিগ্রস্ত ওই কম্পিউটার এবং প্রতিষ্ঠানের একটি অভ্যন্তরীণ এআই টুল ব্যবহার করা হয়। এর মাধ্যমে আরও দুজন প্রকৌশলীর ল্যাপটপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়।
এই সাইবার হামলার প্রভাব পড়ে বিশ্বজুড়ে বাইন্যান্সের গ্রাহকদের ওপর। নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের অর্থ উত্তোলনের সুবিধা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। পরে সেবা চালু হলে গ্রাহকেরা কোটি কোটি ডলারের সম্পদ তুলে নেন।
তদন্তে যুক্ত এফবিআই ও সিক্রেট সার্ভিস
চুরি হওয়া ক্রিপ্টোকারেন্সি শনাক্ত ও উদ্ধারে সহায়তা করছে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি সংস্থা। এফবিআই এবং সিক্রেট সার্ভিস এ বিষয়ে বাইন্যান্সের সঙ্গে কাজ করছে। সাইবার বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ধারণা, হামলার পেছনে উত্তর কোরিয়ার সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে।
তবে উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তা এবং কিম জং উনের বোন কিম ইয়ো জং অভিযোগটিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অপপ্রচারের চেষ্টা বলে অভিহিত করেছেন।
এর আগে ২০২৫ সালে বাইবিট নামের একটি ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জে বড় ধরনের হামলা হয়েছিল। ওই ঘটনায় প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি হয়। সেই হামলার পেছনে উত্তর কোরিয়ার ল্যাজারাস গ্রুপ জড়িত ছিল বলে ধারণা করা হয়।
বাইন্যান্স জানিয়েছে, এফবিআইয়ের সাম্প্রতিক তথ্য হামলার ঘটনায় উত্তর কোরিয়ার সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি নির্দেশ করছে। চুরি হওয়া সম্পদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য তহবিল প্রস্তুত রাখার কথাও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন হামলা ঠেকাতে নিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নয়নের কাজ চলছে।
সূত্র: বিবিসি