• হোম > জাতীয় | বাংলাদেশ > হৃদরোগ হাসপাতালে যন্ত্রপাতি ও জনবল সংকটে ব্যাহত চিকিৎসাসেবা

হৃদরোগ হাসপাতালে যন্ত্রপাতি ও জনবল সংকটে ব্যাহত চিকিৎসাসেবা

  • শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬, ১৩:১৪
  • ৩০

---

ইবি রিপোর্ট

রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে প্রতিদিন বাড়ছে রোগীর ভিড়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জটিল হৃদরোগের চিকিৎসা নিতে আসা অনেক রোগীকে শয্যা না পেয়ে থাকতে হচ্ছে হাসপাতালের মেঝেতে। অনুমোদিত শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় চিকিৎসাসেবার ওপর তৈরি হয়েছে বাড়তি চাপ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চিকিৎসা সরঞ্জামের অচলাবস্থা, জনবল ঘাটতি এবং ব্লাড ব্যাংকের কার্যক্রম নিয়ে নানা অভিযোগ।

শেরেবাংলা নগরের এই সরকারি হাসপাতালে এনজিওগ্রাম, এনজিওপ্লাস্টি, পেসমেকার স্থাপন ও হৃদযন্ত্রের অস্ত্রোপচারসহ বিভিন্ন জটিল চিকিৎসা দেওয়া হয়। এসব সেবা নিতে প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে রোগীরা আসেন। তবে হাসপাতালের ধারণক্ষমতা ও রোগীর সংখ্যার মধ্যে বড় ব্যবধান থাকায় সেবা পেতে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে অনেককে।

গত কয়েক দিনের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, হাসপাতালটির অনুমোদিত শয্যাসংখ্যা ১ হাজার ৪০০। অথচ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ হাজার রোগী সেখানে চিকিৎসাধীন থাকছেন। অর্থাৎ নিয়মিতভাবে অতিরিক্ত ৭০০ থেকে ৮০০ রোগীকে সেবা দিতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে। হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মিজানুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এই অতিরিক্ত ৭০০-৮০০ রোগীর জন্য বাড়তি জনবল না থাকায় সেবার ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হচ্ছে।’

এই চাপ কমাতে বিশেষায়িত হৃদরোগ চিকিৎসা দেশের অন্যান্য পুরোনো মেডিকেল কলেজ ও বিভাগীয় শহরগুলোতে ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, চিকিৎসাসেবা বিকেন্দ্রীকরণ করা গেলে জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালের ওপর রোগীর চাপ কমানো সম্ভব হবে।

হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রমে আরেকটি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে যন্ত্রপাতির অচলাবস্থা। সেখানে থাকা সাতটি এনজিওগ্রাম মেশিনের মধ্যে তিনটি বিকল। এ ছাড়া একমাত্র সিটি এনজিওগ্রাম মেশিনটি সাত-আট বছর ধরে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। যদিও সরকার নতুন দুটি এনজিওগ্রাম মেশিন বরাদ্দ দিয়েছে।

ডা. মিজানুর রহমান বলেন, ‘সিটি এনজিওগ্রাম মেশিনটি চালু করা খুব জরুরি। নতুন দুটি মেশিন চালু হলে সাধারণ এনজিওগ্রামের চাপ হয়তো কমবে, কিন্তু সিটি এনজিওগ্রামের প্রয়োজনীয়তা আলাদা।’ তবে হাসপাতালের নিজস্ব প্যাথলজি বিভাগে যন্ত্রপাতির বড় কোনো সংকট নেই বলে দাবি করেন তিনি।

হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংকের কার্যক্রম নিয়েও চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, নির্ধারিত দায়িত্বের বাইরে গিয়ে বিভাগটি অতিরিক্ত ৭০০ টাকার প্যাকেজে বিভিন্ন পরীক্ষা করছে। অথচ এসব পরীক্ষা করার দায়িত্ব প্যাথলজি ও মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আইন অনুসারে ব্লাড ব্যাংকের কাজ রক্তদাতাদের পাঁচটি প্রাথমিক স্ক্রিনিং পরীক্ষা করা। এগুলো হলো—এইচবিএসএজি, এইচসিভি, এইচআইভি, ভিডিআরএল ও ব্লাড গ্রুপিং। কিন্তু এই সীমার বাইরে এনজিওগ্রাম (পিসিআই), বাইপাস সার্জারি এবং লিভার-সংক্রান্ত জটিলতাসহ বিভিন্ন পরীক্ষা অতিরিক্ত প্যাকেজের আওতায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ৯০ থেকে ১০০টি অতিরিক্ত প্যাকেজ পরীক্ষা করা হয়। এতে মাসে প্রায় ২০ লাখ এবং বছরে প্রায় আড়াই কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। তাঁদের অভিযোগ, হাইকোর্টের একটি রায়ের কথা উল্লেখ করে ব্লাড ব্যাংক এসব অর্থ নিজস্ব তহবিলে জমা করছে। পরে কিছু অসাধু ব্যক্তি ওই অর্থ ভাগ করে নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে প্যাথলজি বিভাগের আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার না হয়ে পড়ে থাকছে।

সহকারী পরিচালক ডা. মিজানুর রহমান বলেন, ‘রক্তদাতাদের নির্ধারিত স্ক্রিনিং পরীক্ষার বাইরে অন্য পরীক্ষা করার এখতিয়ার ব্লাড ব্যাংকের নেই।’ তবে অক্টোবরে শেষ সপ্তাহে তিনি দায়িত্ব নেওয়ায় এ-সংক্রান্ত অনেক অভিযোগের নথি তাঁর কাছে নেই বলে জানান।

রোগীর অতিরিক্ত চাপের পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা কার্যক্রমেও কর্মী সংকট রয়েছে। ডা. মিজানুর রহমান জানান, পরিচ্ছন্নতাকর্মীর ঘাটতি পূরণে ১০০ জন এবং নিরাপত্তা কার্যক্রম জোরদার করতে আরও ১৫০ জন কর্মী নিয়োগের চাহিদা জানিয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া অ্যানেসথেশিয়া, প্যাথলজি, অ্যানাটমি ও ফিজিওলজি বিভাগে চিকিৎসকের কিছু পদ শূন্য রয়েছে।

রোগীদের অপেক্ষার সময় কমাতে সকাল সাড়ে ৭টা থেকে টিকিট কাউন্টার ও বহির্বিভাগ চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অস্ত্রোপচারের রোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ ও ওষুধ নেওয়ার অভিযোগে আউটসোর্সিংয়ের দুজন কর্মীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। অন্যদের বিরুদ্ধে তদন্তের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান সহকারী পরিচালক।

হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা স্বাভাবিক রাখতে রোগীর চাপের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শয্যা বাড়ানো, বিকল সিটি এনজিওগ্রাম মেশিন সচল করা এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে ব্লাড ব্যাংকের পরীক্ষা ও অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে। এসব সমস্যার সমাধান না হলে হৃদরোগের চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/21338 ,   Print Date & Time: Saturday, 7 November 2026, 11:45:13 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh