• হোম > আন্তর্জাতিক | বিদেশ > কেনিয়ায় ১৯১ জনকে অনাহারে হত্যার দায়ে ধর্মগুরুর ২০০ বছরের কারাদণ্ড

কেনিয়ায় ১৯১ জনকে অনাহারে হত্যার দায়ে ধর্মগুরুর ২০০ বছরের কারাদণ্ড

  • শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬, ১৩:০২
  • ২২

---

ইবি আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ধর্মীয় বিশ্বাসকে ব্যবহার করে অনুসারীদের অনাহারে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার ঘটনায় কেনিয়ায় আলোচিত ধর্মীয় গোষ্ঠীর নেতা পল ম্যাকেঞ্জিকে ২০০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। তাঁর নির্দেশে ১৯১ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে মামলায় উঠে এসেছে। নিহতদের মধ্যে একজন ছাড়া বাকি সবাই শিশু। অনুসারীদের বলা হয়েছিল, না খেয়ে মারা গেলে তাঁরা ‘যিশুর সঙ্গে মিলিত’ হতে পারবেন।

শুক্রবার কেনিয়ার আদালত ম্যাকেঞ্জি এবং তাঁর ২৮ সহযোগীকে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে এই রায় ঘোষণা করেন। বিচারক ডায়ানা মোচাচে বলেন, অনুসারীদের অনাহারে মৃত্যুর নির্দেশ দেওয়ার ঘটনায় ম্যাকেঞ্জিরই ‘প্রধান অপরাধমূলক দায়’ রয়েছে।

রায় ঘোষণার সময় বিচারক বলেন, ‘এ ধরনের নৃশংসতার জন্য আইনে অনুমোদিত সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়ার স্পষ্ট বার্তা দিতে এ সাজা যথাযথ ও ন্যায়সংগত।’

আদালত ম্যাকেঞ্জিকে হত্যার দায়ে ১০০ বছর এবং অনাহারে মৃত্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধে আরও ১০০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। প্রতিটি অপরাধের শ্রেণিতে সাজাগুলো একসঙ্গে কার্যকর হবে। তবে দুই শ্রেণির সাজা পরপর কার্যকর হওয়ায় তাঁর মোট কারাদণ্ডের মেয়াদ দাঁড়িয়েছে ২০০ বছর।

রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা ম্যাকেঞ্জির মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছিলেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, হত্যাকাণ্ডের ব্যাপকতা ও ভয়াবহতা বিবেচনায় সর্বোচ্চ শাস্তিই তাঁর প্রাপ্য। তবে বিচারক ডায়ানা মোচাচে মৃত্যুদণ্ড দেননি। তাঁর মতে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে অপরাধীর সংশোধন ও পুনর্বাসনের সুযোগ শেষ হয়ে যাবে। কেনিয়ায় ১৯৮৭ সালের পর কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি।

ম্যাকেঞ্জির সঙ্গে দোষী সাব্যস্ত হওয়া ২৮ সহযোগীর মধ্যে রয়েছেন তাঁর নির্দেশ বাস্তবায়নকারী পাহারাদার এবং গণকবরে মরদেহ লুকাতে সহায়তাকারীরা। তাঁদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সহযোগীদের মধ্যে সর্বোচ্চ সাজা ১৬০ বছর।

২০২৩ সালে কেনিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলের শাকাহোলা বনের অগভীর গণকবর থেকে চার শতাধিক মরদেহ উদ্ধারের পর গ্রেপ্তার হন পল ম্যাকেঞ্জি। ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

বিচারক মোচাচে গত মাসে আট ঘণ্টা ধরে রায় পাঠ করেন। এতে উঠে আসে, ম্যাকেঞ্জির অনুসারীরা তাঁকে ‘যিশুর মুখপাত্র’ বলে বিশ্বাস করতেন। তাঁর ধর্মীয় নির্দেশ অমান্য করলে অনুসারীদের মারধর করে হত্যা করা হতো।

আদালতে ম্যাকেঞ্জির এক সহযোগী জানান, উপবাসের নির্দেশ মানতে অস্বীকৃতি জানানো ব্যক্তিদের ‘লাথি ও ঘুষি মেরে স্বর্গে পাঠাতে’ বলা হয়েছিল। বনের মধ্যে অনুসারীদের কবর দেওয়াকে ‘বিয়ে’ বলা হতো। কেউ মারা গেলে তাঁকে ‘যিশুর সঙ্গে বিয়ে হয়েছে’ বলে উদ্‌যাপন করা হতো।

আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, এসব মৃত্যু বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল না। ধর্মীয় শিক্ষা ও নির্দেশের মাধ্যমে অনুসারীদের প্রাণঘাতী উপবাসে বাধ্য করার একটি সংগঠিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল।

ময়নাতদন্তে দেখা গেছে, অধিকাংশ মানুষের মৃত্যু হয়েছে অনাহারে। অন্যদের কেউ শ্বাসরোধে, কেউ গলায় ফাঁস দিয়ে এবং কেউ মাথায় আঘাতের কারণে মারা গেছেন। কয়েকজনের মরদেহ পচে যাওয়ায় মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। উদ্ধার হওয়ার পর অতিরিক্ত শারীরিক দুর্বলতার কারণেও কয়েকজনের মৃত্যু হয়।

শুক্রবার রায় ঘোষণার আগে বিবিসির নিউজডে অনুষ্ঠানে কথা বলেন ফ্রান্সিস ওয়াঞ্জে। শাকাহোলা বনে তিনি পরিবারের আট সদস্যকে হারিয়েছেন, যাঁদের মধ্যে দুই নাতি-নাতনিও রয়েছে। তিনি ম্যাকেঞ্জির অপরাধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শাস্তির প্রত্যাশা করেছিলেন।

ম্যাকেঞ্জি ও তাঁর সহযোগীরা আদালতে সাজা কমানোর আবেদন করেছিলেন। ১৯ অক্টোবর দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগে তাঁরা সবাই নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, কাউকে মৃত্যুর জন্য বাধ্য করা হয়নি।

ওয়াঞ্জে জানান, ২০২৩ সালের মার্চে তিনি পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছিলেন। তাঁর পরিবারের এক পুলিশ সদস্য এবং কাল্ট থেকে পালিয়ে আসা এক ব্যক্তি তাঁর এক নাতিকে উদ্ধার করতে সক্ষম হন। শিশুটি পুলিশকে ঘটনার বিবরণ দেয় এবং তার ভাইবোনদের কবর দেখিয়ে দেয়। ওয়াঞ্জে বলেন, ‘ওটা ছিল আমার নাতির জীবনের শেষ দিন। তারাও তাকে হত্যা করত।’

২০০৩ সালে ‘গুড নিউজ ইন্টারন্যাশনাল মিনিস্ট্রিজ’ নামে গির্জা প্রতিষ্ঠা করেন ম্যাকেঞ্জি। পরবর্তী ১৬ বছরে কেনিয়ার বিভিন্ন শাখায় তাঁর হাজারো অনুসারী তৈরি হয়। মালিন্দিতে অবস্থিত তাঁর গির্জা থেকে ধর্মীয় বক্তব্য প্রচার করা হতো। এ জন্য ‘টাইমস টিভি’ নামে একটি টেলিভিশন চ্যানেলও পরিচালনা করতেন তিনি।

ম্যাকেঞ্জির ‘এন্ড ডেজ’ বা শেষ দিনের বক্তৃতায় বিভিন্ন ষড়যন্ত্রতত্ত্ব প্রচার করা হতো। তিনি শিক্ষাকে ‘অশুভ’, স্বাস্থ্যসেবাকে ধর্মীয় মতবাদের পরিপন্থী এবং ডিজিটাল পরিচয়পত্রকে ‘শয়তানের চিহ্ন’ বলে বর্ণনা করতেন। ২০১৯ সালে গির্জাটি বন্ধ হয়ে গেলে তিনি শাকাহোলা বনে চলে যান এবং অনুসারীদেরও সেখানে যাওয়ার আহ্বান জানান।

ঘটনার পর কেনিয়ায় ধর্মীয় কার্যক্রমের ওপর নজরদারি এবং উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটো তদন্ত কমিশন গঠন করলেও পরে সেটিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়। রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত কেনিয়া ন্যাশনাল কমিশন অন হিউম্যান রাইটসের (কেএনসিএইচআর) তদন্তে বলা হয়, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা কাল্টটির কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বারবার অবগত হয়েও ব্যবস্থা নেননি।

ম্যাকেঞ্জি ও তাঁর সহযোগীদের সাজা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য কিছুটা ন্যায়বিচারের সুযোগ তৈরি করেছে। তবে মামলায় ১৯১ জনের মৃত্যুর বিষয়টি বিবেচনায় এলেও শাকাহোলা বন থেকে চার শতাধিক মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/21336 ,   Print Date & Time: Saturday, 7 November 2026, 11:55:02 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh