• হোম > অর্থনীতি | জাতীয় | দেশজুড়ে > আমদানি ব্যয় বাড়ায় প্রথম প্রান্তিকে বাণিজ্য ঘাটতি উল্লম্ফন

আমদানি ব্যয় বাড়ায় প্রথম প্রান্তিকে বাণিজ্য ঘাটতি উল্লম্ফন

  • শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬, ১২:২৮
  • ৩৩

---

ইবি রিপোর্ট

চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধিতে বেড়েছে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি। রপ্তানি ও রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি থাকলেও আমদানি ব্যয়ের দ্রুত উল্লম্ফন বাড়িয়েছে বৈদেশিক খাতের চাপ। সেপ্টেম্বর শেষে চলতি হিসাবও উদ্বৃত্ত অবস্থা থেকে ঘাটতিতে নেমেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্য থেকে এই চিত্র পাওয়া গেছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭.৪৭ বিলিয়ন ডলারে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৫.৭১ বিলিয়ন ডলার।

ইপিজেডসহ এফওবি মূল্যে মোট আমদানি ব্যয় ১৫.১ শতাংশ বেড়ে ১৯.৩৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি ব্যয় ছিল ১৬.৮ বিলিয়ন ডলার। শুধু জুলাই ও আগস্ট মাসেই আমদানি ব্যয় দাঁড়িয়েছিল ১২.২০ বিলিয়ন ডলারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, “জুলাই-আগস্টে মোট আমদানির পরিমাণ যেখানে ১২ বিলিয়ন ডলার ছিল, সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে ১৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে—অর্থাৎ এক মাসেই আমদানি ব্যয় প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে।”

তিনি বলেন, “আমদানির বৃদ্ধির তুলনায় রপ্তানি সেভাবে বাড়েনি। রপ্তানি বেড়েছে মাত্র ৩ বিলিয়ন ডলারের মতো, যার ফলে আমদানি ও রপ্তানির মধ্যকার ব্যবধান অনেকটাই বেড়ে গেছে।”

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, কাঁচামাল এবং বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয় বেড়েছে। ড. এজাজুল ইসলাম বলেন, “বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামসহ আমদানিকৃত বিভিন্ন কাঁচামাল ও পণ্যের দাম বেশি থাকায়– সামগ্রিক আমদানি মূল্য অনেক বেশি দিতে হচ্ছে।”

একই সময়ে ইপিজেডসহ এফওবি মূল্যে রপ্তানি আয় ৭ শতাংশ বেড়ে ১১.৮৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। গত বছরের একই সময়ে রপ্তানি আয় ছিল ১১.০৮ বিলিয়ন ডলার। শিপমেন্ট বা চালানভিত্তিক মোট রপ্তানিও ৬.৪ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১৩.০৫ বিলিয়ন ডলার।

জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি ৬.২ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়ে আরএমজি খাতের রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ১০.৫৪ বিলিয়ন ডলারে। আগের বছরের একই সময়ে এই খাতের রপ্তানি ছিল ৯.৯২ বিলিয়ন ডলার।

চলতি হিসাব আবার ঘাটতিতে

এক মাস আগেও বাংলাদেশের চলতি হিসাবের ভারসাম্য উদ্বৃত্ত অবস্থানে ছিল। তবে সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে সেটি ঋণাত্মক অবস্থায় নেমেছে। প্রথম প্রান্তিকে চলতি হিসাবের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১.৩ বিলিয়ন ডলারে।

গত অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৮২১ মিলিয়ন ডলার। অথচ এক মাস আগেও চলতি হিসাবে ৫৯১ মিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত ছিল।

ড. এজাজ বলেন, “আমাদের কারেন্ট অ্যাকাউন্ট পজিটিভ ছিল, এটাই থাকার কথা, কারণ এখন রেমিট্যান্সে গ্রোথ ভালো। তবে সেপ্টেম্বর শেষে এটা নেগেটিভ হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “মূলত আমদানির ব্যয় অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ার কারণেই কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্স নেগেটিভ বা ঘাটতিতে রূপ নিয়েছে।”

মূলধন, আর্থিক এবং ভুল ও বাদপড়া খাতে ২৫৯ মিলিয়ন ডলার সমন্বয় করা হয়েছে। এরপর সার্বিক লেনদেন ভারসাম্যে ১.১৬ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এর ফলে সমপরিমাণ নিট রিজার্ভ সম্পদও সমন্বয় করতে হয়েছে।

রেমিট্যান্সে কিছুটা স্বস্তি

বৈদেশিক খাতের চাপ সামলাতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে প্রবাসী আয়। আলোচ্য সময়ে রেমিট্যান্স ১৩.৩ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৫৯ বিলিয়ন ডলারে। গত বছরের একই সময়ে প্রবাসী আয় ছিল ৭.৫৮ বিলিয়ন ডলার।

বেসরকারি একটি ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের প্রধান বলেন, “এলএনজির দরবৃদ্ধির কারণে এখন ডলারের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। রপ্তানি, রেমিট্যান্স ও উন্নয়ন সহযোগীদের বিদেশি ঋণ ছাড়—সে হারে বাড়ছে না।”

তিনি বলেন, “বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে এখনকার ডলার বাজারে এই খারাপ অবস্থা তৈরি হয়েছে।”

আর্থিক হিসাবে ইতিবাচক প্রবাহ থাকলেও তা কমে ৩২৩ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে। গত বছরের একই সময়ে এই প্রবাহ ছিল ১.৭৯৬ বিলিয়ন ডলার। এ সময়ে এফডিআই ৩৫৮ মিলিয়ন ডলারে তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে।

তবে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ ছাড় প্রায় ৪৮ শতাংশ কমেছে। এই ঋণপ্রবাহ কমে দাঁড়িয়েছে ৫৪২ মিলিয়ন ডলারে। এজাজুল ইসলাম বলেন, “পোর্টফোলিও ইনভেস্টমেন্ট এবং দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার কারণে ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টের নিট প্রবাহও—গত বছরের ১.৭৯ বিলিয়ন ডলার থেকে আশঙ্কাজনকভাবে কমে, মাত্র ৩২৩ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।”

সেপ্টেম্বর ২০২৬ শেষে দেশের গ্রস বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৬.০১ বিলিয়ন ডলারে। আইএমএফের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভের পরিমাণ ৩১.১৯ বিলিয়ন ডলার। এই রিজার্ভ দিয়ে প্রায় ৪.৮ মাসের পণ্য ও সেবা আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব।

শুধু পণ্য আমদানির ব্যয় মেটানো যাবে প্রায় ৫.৩ মাসের জন্য। এজাজুল ইসলাম বলেন, “আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যারেলপ্রতি ১১৭ ডলারের মতোন তেলের উচ্চমূল্য, একইসঙ্গে নিত্যপণ্যের দর চড়া থাকায় অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বরেও ট্রেড ব্যালেন্স এবং চলতি হিসাবের ঘাটতির এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা (আপট্রেন্ড) বজায় থাকতে পারে।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, “জ্বালানি সংকট মেটাতে স্পট মার্কেট থেকে অনেক বেশি দরে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। যার কারণে ট্রেড ডেফিসিট (বাণিজ্য ঘাটতি) বেড়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “সামনের দিনে রপ্তানির পরিমাণ বাড়লে এই ঘাটতির পরিমাণ কমে যাবে।” এদিকে ডলারের দর বৃদ্ধির সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির গতিও থমকে গেছে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/21323 ,   Print Date & Time: Saturday, 7 November 2026, 11:45:13 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh