• হোম > এআই | কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা | টেকনোলজি | বিদেশ > এআই শেয়ারের ধসে কাঁপল এশিয়ার বাজার

এআই শেয়ারের ধসে কাঁপল এশিয়ার বাজার

  • শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬, ২৩:৪১
  • ৭

---

সিএনএন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতের ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ ও নীতিগত অনিশ্চয়তায় বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি শেয়ারে বড় ধরনের বিক্রির চাপ তৈরি হয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ালস্ট্রিটে প্রায় আড়াই ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্য হারিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বড় ধাক্কা লেগেছে এশিয়ার পুঁজিবাজারে। এক মাসে দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও জাপানের প্রধান তিনটি প্রযুক্তিনির্ভর সূচক কমেছে ১৯ থেকে ২৭ শতাংশ পর্যন্ত। তবে বড় দরপতনের পর শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি শেয়ারে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর প্রবণতা দেখা গেছে।

শুক্রবার লেনদেনের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের শেয়ারে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যায়। বাজার খোলার পর নাসডাক সূচক ১ দশমিক ৩ শতাংশ এবং এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ বাড়ে। তবে ডাও জোন্স সূচক কমে ০ দশমিক ৯ শতাংশ। আগের দিনের বড় দরপতনের পর কম দামে শেয়ার কেনার সুযোগ নিতে কিছু বিনিয়োগকারী বাজারে ফিরেছেন বলে এই উত্থানের ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে।

বৃহস্পতিবার বড় দরপতনের শিকার হওয়া এআই-সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ারেও শুক্রবার কিছুটা পুনরুদ্ধার দেখা যায়। এনভিডিয়ার শেয়ারদর ৫ দশমিক ৫ শতাংশ এবং স্পেসএক্সের ৪ শতাংশ বাড়ে। অথচ এর আগের দিন প্রতিষ্ঠান দুটির শেয়ারদর ৯ শতাংশের বেশি কমেছিল। এনভিডিয়ার জন্য এটি ছিল ২০২৫ সালের জানুয়ারির পর এক দিনে সবচেয়ে বড় দরপতন।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ঘুরে দাঁড়ানোর আভাস মিললেও এশিয়ার বাজারে তখনো বিক্রির চাপ অব্যাহত ছিল। শুক্রবার দিন শেষে দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি ও জাপানের নিকেই ২২৫ সূচক উভয়ই ৬ শতাংশ কমে যায়। তাইওয়ানের তাইএক্স সূচকের পতন হয় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। ইউরোপের বাজারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ইউরোপের বেঞ্চমার্ক স্টক্স ৬০০ সূচক কমে ১ দশমিক ৭ শতাংশ। ফ্রান্সের সিএসি ৪০ কমেছে ১ দশমিক ৯ শতাংশ এবং জার্মানির ড্যাক্স ২ দশমিক ৪ শতাংশ।

ফ্যাক্টসেটের তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ অক্টোবর থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত এক মাসে এশিয়ার তিনটি প্রধান প্রযুক্তিনির্ভর সূচকে বড় পতন হয়েছে। এ সময়ে কোসপি সূচক সর্বোচ্চ ২৭ শতাংশ, তাইএক্স ২০ শতাংশ এবং নিকেই ২২৫ সূচক ১৯ শতাংশ কমেছে। চিপসহ বৈশ্বিক ইলেকট্রনিকস সরবরাহব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার থেকে বিনিয়োগকারীদের সরে যাওয়াকে এই পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে এআই ডেটা সেন্টারের যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিক্রির চাপে পড়েছে।

বিশ্ববাজারের এই অস্থিরতার পেছনে এআই খাতে বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলও ভূমিকা রাখছে। নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে জয় পেয়েছে। এতে দেশটির এআই অবকাঠামো নির্মাণ ও সম্প্রসারণের ব্যয় নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

কলাম্বিয়া বিজনেস স্কুলের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, গত বছরের শেষ দিক পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় পুরো প্রবৃদ্ধির পেছনে এআই অবকাঠামো খাতের বিনিয়োগের ভূমিকা ছিল। তবে নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণের পরিবেশগত ও স্থানীয় সামাজিক প্রভাব নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। নির্বাচনে এআই খাতের ব্যয়ও অন্যতম আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়। ডেমোক্র্যাটদের বিজয়ের পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, নতুন কংগ্রেস এআই অবকাঠামো নির্মাণের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে পারে কিংবা এসব প্রকল্পের গতি কমিয়ে দিতে পারে।

এই উদ্বেগের প্রভাব পড়ে ওয়ালস্ট্রিটে। বৃহস্পতিবার নাসডাক সূচক ৫ দশমিক ৫ শতাংশ কমে যায়। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্ক ঘোষণার পর এটিই ছিল সূচকটির সবচেয়ে বড় পতন।

এদিকে বাজারের অস্থিরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি শুক্রবার বলেন, এআই ও চিপ খাতের শেয়ারদর দ্রুত কমার বিষয়টি সরকার পর্যবেক্ষণ করছে। অর্থনীতি শক্তিশালী করার পদক্ষেপগুলোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথাও জানান তিনি।

দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থ ও অর্থনীতিবিষয়ক মন্ত্রী লি হিয়ং-ইল শুক্রবার এ পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি বৈঠক করেন। দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মার্কিন নির্বাচনের প্রভাব বিশ্ববাজারে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারে যাতে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া তৈরি না হয়, সে জন্য আগাম পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মধ্যে অবশ্য এআই খাতের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা নিয়ে পুরোপুরি নেতিবাচক মনোভাব নেই। ফিবোনাচ্চি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট গ্লোবালের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী জং ইন ইয়ুনের মতে, বিনিয়োগকারীরা এআই খাতে বিনিয়োগ এবং নীতিগত পরিস্থিতি নিয়ে নিজেদের প্রত্যাশা নতুন করে মূল্যায়ন করছেন। তবে স্যামসাং ইলেকট্রনিকস ও এসকে হাইনিক্সের তৈরি মেমোরি চিপ এবং কম্পিউটিং সক্ষমতার চাহিদা ভবিষ্যতেও বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।

হংকংভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইই ক্যাপিটালের অংশীদার থিওডোর শৌর মতে, বছরের শুরুতে এআই নিয়ে বাজারে অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছিল। বর্তমান দরপতনকে সেই উচ্ছ্বাসের পর বাজারের স্বাভাবিক সংশোধন হিসেবেও দেখা যেতে পারে। তাঁর ধারণা, ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের কারণে ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার বৃদ্ধির গতি কমতে পারে। ঋণের খরচ কমলে তা শেয়ারবাজারের জন্য ইতিবাচক হতে পারে।

তবে বাজারের অস্থিরতা দ্রুত কাটবে, এমন নিশ্চয়তা দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। আগামী বছরের জানুয়ারিতে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দায়িত্ব নেওয়ার আগপর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ও মুদ্রানীতির সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা থাকতে পারে। এশিয়ান মার্কেট সেন্সের অ্যান্ড্রু সুলিভানের মতে, ভবিষ্যৎ নীতিগত পরিস্থিতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না থাকায় বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করে অর্থ নগদে রাখার পথ বেছে নিচ্ছেন।

সব মিলিয়ে এআই খাতের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা এখনো বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হলেও এর সম্প্রসারণের ব্যয়, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং ভবিষ্যৎ নীতির অনিশ্চয়তা বাজারের হিসাব বদলে দিচ্ছে। ফলে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক সম্ভাবনার পাশাপাশি নীতিগত পরিবেশও এখন বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের বড় বিবেচ্য হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতি কতটা স্পষ্ট হয়, তার ওপরই আগামী দিনগুলোতে এআই-নির্ভর শেয়ারবাজারের গতিপথ অনেকাংশে নির্ভর করবে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/21309 ,   Print Date & Time: Friday, 6 November 2026, 06:04:31 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh