• হোম > ইন্টাপ্রেনিউর | উদ্যোক্তা | দেশজুড়ে > লভ্যাংশ করের নতুন নিয়মে উদ্যোক্তাদের স্বস্তি, চাপে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী

লভ্যাংশ করের নতুন নিয়মে উদ্যোক্তাদের স্বস্তি, চাপে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী

  • শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬, ১৮:০১
  • ৯

---

ইবি রিপোর্ট

লভ্যাংশ আয়ের ওপর করহার ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করে নতুন করব্যবস্থা চালু করেছে বাংলাদেশ। এতে বড় উদ্যোক্তা ও শীর্ষ করদাতাদের ব্যক্তিগত করের বোঝা কমার সুযোগ তৈরি হলেও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে ভিন্ন চিত্র। বিশেষ করে যাঁদের বার্ষিক আয় করমুক্ত সীমার মধ্যে, তাঁদেরও লভ্যাংশ পাওয়ার সময় ১৫ শতাংশ কর কেটে রাখার নিয়ম বাড়তি চাপ তৈরি করছে। ফলে নতুন এই নীতিতে কারা লাভবান হচ্ছেন, আর কারা তুলনামূলক বেশি কর দিচ্ছেন, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন আলোচনা।

বাংলাদেশে আগে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের লভ্যাংশ আয় সাধারণ আয়ের সঙ্গে যুক্ত করে কর নির্ধারণ করা হতো। উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই করহার সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাত। সারচার্জ প্রযোজ্য হলে তা বেড়ে ৩৭ থেকে ৩৮ শতাংশ হতে পারত। অর্থাৎ ১০০ টাকা লভ্যাংশ আয়ের বিপরীতে কর দিতে হতো ৩৭ থেকে ৩৮ টাকা। পাশাপাশি উৎসে কেটে রাখা করকে ন্যূনতম কর হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ফলে অতিরিক্ত কর কেটে রাখা হলেও তা সমন্বয় বা ফেরত পাওয়ার সুযোগ ছিল না।

অর্থ আইন ২০২৬-এর মাধ্যমে ২০২৬–২৭ করবর্ষ থেকে এই ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। আয়কর আইনের সপ্তম তফসিল অনুযায়ী, ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের লভ্যাংশ আয়ের ওপর নির্ধারিত করহার এখন ১৫ শতাংশ। একই সঙ্গে উৎসে কর্তিত করকে চূড়ান্ত ন্যূনতম করের পরিবর্তে অগ্রিম আয়কর হিসেবে গণ্য করার বিধান করা হয়েছে।

উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের জন্য নতুন সুযোগ

নতুন করব্যবস্থায় কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা, উদ্যোক্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকেরা সুবিধা পেতে পারেন। আগের নিয়মে অনেক পরিচালক লভ্যাংশের পরিবর্তে বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিতে আগ্রহী ছিলেন। কারণ, এসব ব্যয় কোম্পানির খরচ হিসেবে দেখানো যায়, যা করযোগ্য মুনাফা কমাতে সহায়তা করে।

কিন্তু নতুন নিয়মে ব্যক্তিগত পর্যায়ে লভ্যাংশের করহার ১৫ শতাংশ হওয়ায় পরিস্থিতি বদলেছে। যেসব উদ্যোক্তা বেতনের ওপর সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ হারে কর দিতেন, তাঁরা লভ্যাংশ গ্রহণ করলে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ১৫ শতাংশ কর দিতে পারবেন। এতে তাঁদের ব্যক্তিগত করভার প্রায় অর্ধেকে নেমে আসতে পারে।

এ ছাড়া কোম্পানির কর-পরবর্তী মুনাফা থেকেই লভ্যাংশ বিতরণ করতে হয়। ফলে অযৌক্তিক পরিচালন ব্যয় বা অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা দেখানোর পরিবর্তে প্রকৃত মুনাফা থেকে লভ্যাংশ দেওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে। এতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কোম্পানি পর্যায়ে কর পাওয়ার পাশাপাশি ব্যক্তিপর্যায়ে লভ্যাংশের ওপর ১৫ শতাংশ করও পাবে।

ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের করের চাপ

বড় উদ্যোক্তারা সুবিধা পেলেও সাধারণ ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন নিয়মটি বাড়তি ব্যয়ের কারণ হতে পারে। লভ্যাংশের ওপর উৎসে করের হার ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো গৃহিণী, অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী বা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর বছরে লভ্যাংশ আয় ৩ লাখ টাকা হলে তাঁকে শুরুতেই ১৫ শতাংশ হারে ৪৫ হাজার টাকা কর দিতে হবে। এমনকি তাঁর মোট আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকলেও কিংবা ১০ শতাংশ করের স্তরে পড়লেও উৎসে ১৫ শতাংশ কর কেটে রাখা হচ্ছে।

প্রতিযোগী দেশগুলোর করব্যবস্থা

লভ্যাংশ করের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের নীতির সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের অবস্থানও বোঝা যায়।

ভারতে লভ্যাংশ আয়ের জন্য আলাদা নির্দিষ্ট করহার নেই। ব্যক্তির অন্যান্য আয়ের সঙ্গে এই অর্থ যোগ করে নিয়মিত করহার অনুযায়ী কর নেওয়া হয়। উচ্চ আয়ের ক্ষেত্রে সারচার্জসহ কর ৩০ শতাংশের বেশি হতে পারে। তবে লভ্যাংশ বিতরণের সময় কোম্পানি প্রাথমিকভাবে ১০ শতাংশ উৎসে কর কেটে রাখে।

ইন্দোনেশিয়ায় ব্যক্তিপর্যায়ে লভ্যাংশের ওপর সাধারণত ১০ শতাংশ চূড়ান্ত কর দিতে হয়। তবে লভ্যাংশের অর্থ দেশের উৎপাদনশীল বা যোগ্য কোনো খাতে তিন বছরের জন্য পুনর্বিনিয়োগ করলে ওই আয়ের ওপর কর দিতে হয় না।

মালয়েশিয়ায় সিঙ্গেল টিয়ার করব্যবস্থা চালু রয়েছে। সেখানে কোম্পানি পর্যায়ে কর পরিশোধের পর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ১ লাখ রিঙ্গিত পর্যন্ত লভ্যাংশের ওপর ব্যক্তিগত কর দিতে হয় না। এই সীমা অতিক্রম করলে ২ শতাংশ কর প্রযোজ্য হয়।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের রপ্তানি ও বিদেশি বিনিয়োগের প্রতিযোগী ভিয়েতনামে ব্যক্তিশ্রেণির লভ্যাংশের ওপর মাত্র ৫ শতাংশ কর কাটা হয়। ফলে এ অঞ্চলের তুলনায় বাংলাদেশের ১৫ শতাংশ করহার উদ্যোক্তাদের জন্য সুবিধাজনক হলেও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার তুলনায় তা বেশি।

পুঁজিবাজারে সম্ভাব্য প্রভাব ও করণীয়

লভ্যাংশের ওপর নির্দিষ্ট ১৫ শতাংশ কর পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। ভালো লভ্যাংশ দেওয়া এবং শক্তিশালী মৌলভিত্তির কোম্পানিতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ার সুযোগ রয়েছে। এতে স্বল্পমেয়াদি ক্যাপিটাল গেইনের পরিবর্তে নিয়মিত লভ্যাংশ পাওয়ার আশায় শেয়ার ধরে রাখার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।

পাশাপাশি উদ্যোক্তারা আইন মেনে নির্ধারিত কর দিয়ে কোম্পানির মুনাফা ব্যক্তিগত হিসাবে নিতে পারবেন। এতে আর্থিক বিবরণীতে কৃত্রিম হিসাব তৈরির প্রবণতাও কমতে পারে।

ব্যবসায়ীদের একটি যুক্তি হলো, কোম্পানি কর-পরবর্তী মুনাফা থেকে লভ্যাংশ দেয়। তাই সেই অর্থের ওপর আবার কর আরোপ দ্বৈত করের শামিল। অর্থ আইন ২০২৬-এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট ১৫ শতাংশ লভ্যাংশ কর চালু করাকে করব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও ব্যবসাবান্ধব উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে এই নীতির সুফল সব শ্রেণির বিনিয়োগকারীর কাছে পৌঁছে দিতে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য করছাড়ের প্রস্তাব দিয়েছেন স্নেহাশীষ বড়ুয়া। তাঁর মতে, নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত, যেমন ১ লাখ টাকা লভ্যাংশ আয় করমুক্ত রাখা যেতে পারে। বিকল্প হিসেবে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত লভ্যাংশ আয়ের ওপর ১৫ শতাংশের পরিবর্তে ৫ শতাংশ কর নির্ধারণের প্রস্তাবও দিয়েছেন তিনি।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/21307 ,   Print Date & Time: Friday, 6 November 2026, 12:42:16 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh