![]()
ইবি রিপোর্ট
আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম বাড়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ। প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) এলএনজির দাম ২০ ডলার হলে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসে সরকারকে ৬০ টাকার বেশি ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। চলতি বছর সরবরাহ বিঘ্নের কারণে এর চেয়েও বেশি দামে গ্যাস কিনতে হয়েছে। বাড়তি এই ব্যয়ের পাশাপাশি এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগের সম্ভাবনাও কমছে।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। ‘এলএনজি-টু-পাওয়ার ইন ইমার্জিং এশিয়া: আ ফাইভ-ইয়ার রিভিউ অব প্রজেক্ট আউটকামস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের গত পাঁচ বছরের এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প পর্যালোচনা করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে চার দেশে প্রস্তাবিত ৪৯টি এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ২২টি আমদানি টার্মিনাল বাতিল হয়েছে অথবা বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। এসব প্রকল্পের সম্মিলিত ব্যয় ৬ হাজার ৭৮০ কোটি ডলার। অথচ চার দেশে প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ১১ শতাংশ এবং এলএনজি আমদানি টার্মিনালের সক্ষমতার ১৫ শতাংশ চালু করা সম্ভব হয়েছে।
আইইইএফএ চার দেশে সম্ভাব্য ১০ হাজার ৯২০ কোটি ডলারের ৯২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ২ হাজার ১০০ কোটি ডলারের ৪৪টি আমদানি টার্মিনাল পর্যালোচনা করেছে। বাস্তবায়িত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে গড়ে সাত বছরের বেশি সময় নিয়েছে। যদিও প্রকল্প উন্নয়নকারীরা সাধারণত তিন থেকে চার বছরের মধ্যে উৎপাদন শুরুর পরিকল্পনা করেন।
প্রতিবেদনে প্রকল্প বাস্তবায়নে পিছিয়ে পড়ার কারণ হিসেবে এলএনজির দামের অস্থিরতা, নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি, গ্যাস টারবাইন সরবরাহে দীর্ঘসূত্রতা এবং ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়নকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কারণে প্রকল্পের অর্থায়ন ব্যয় বেড়েছে এবং ব্যাংকঋণ পাওয়াও কঠিন হয়েছে।
প্রতিবেদনের সহলেখক ক্রিস্টোফার ডোলম্যানের মতে, এসব ঝুঁকির কারণে এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জীবনকালীন প্রতি ইউনিট উৎপাদন ব্যয় ২০২১ সালের প্রাথমিক হিসাবের তুলনায় সর্বোচ্চ ১৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে এশিয়ার স্পট বাজারে এলএনজির দাম এমএমবিটিইউপ্রতি ২৭ দশমিক ৫ ডলারে পৌঁছেছিল, যা সংঘাত শুরুর আগের দামের প্রায় তিন গুণ।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ব্যয়ের প্রভাব পড়ছে সরকারি ভর্তুকি ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের পর দেশে তিনটি এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হয়েছে। কিন্তু জ্বালানি ও বিদ্যুতের উচ্চমূল্যের কারণে ভর্তুকির চাপ বেড়েছে। রিজার্ভ ধরে রাখতেও বহিঃস্থ অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা গভীর হয়েছে। এত ব্যয়ের পরও এলএনজি সরবরাহের অনিশ্চয়তায় গ্যাসসংকট কাটেনি।
আইইইএফএ’র বাংলাদেশ বিষয়ক প্রধান জ্বালানিবিশ্লেষক শফিকুল আলম মনে করেন, শুধু এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে এ সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। দেশের অব্যবহৃত গ্যাসসম্পদ কাজে লাগানো, জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শিল্পকারখানায় গ্যাসচালিত বয়লারের পরিবর্তে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন হিট পাম্প ব্যবহারের বিষয়টিও বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় কমছে। এসব প্রকল্প তুলনামূলক দ্রুত বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে। ব্যাটারিতে বিদ্যুৎ সংরক্ষণের সক্ষমতা বাড়ায় চাহিদার সর্বোচ্চ সময়ে সরবরাহের জন্য গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতাও কমতে পারে।
চার দেশের পরিস্থিতিও ভিন্ন। ফিলিপাইনে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি ও অর্থায়নের অনিশ্চয়তায় প্রকল্প বাতিল হয়েছে। ভিয়েতনামে পাঁচ বছরে মাত্র একটি এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাণিজ্যিক উৎপাদনে এসেছে। থাইল্যান্ডে প্রকল্পের অগ্রগতি তুলনামূলক ভালো হলেও বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্র ও টার্মিনালের বড় অংশের সক্ষমতা অব্যবহৃত রয়েছে।