![]()
ইবি রিপোর্ট
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়েও সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিতে পারেননি বিএনপির প্রার্থী আসলাম চৌধুরী। তাঁর প্রার্থিতা বাতিল করে আপিল বিভাগের রায়ের পরও চট্টগ্রাম-৪ আসনের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। ফলে সীতাকুণ্ড ও চট্টগ্রাম নগরের দুটি ওয়ার্ডের প্রায় সাড়ে ছয় লাখ মানুষ সংসদীয় জনপ্রতিনিধি ছাড়াই রয়েছেন। পুনর্নির্বাচন হবে, নাকি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হবে—তা নিয়েও অনিশ্চয়তা কাটেনি।
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রায় ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও চট্টগ্রাম-৪ আসনে সংসদ সদস্যের বিষয়টি অমীমাংসিত রয়েছে। আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা কিংবা রাজনৈতিক নেতারা কেউই কবে নাগাদ এ জটিলতার সমাধান হবে, তা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। এতে এলাকার উন্নয়ন, অবকাঠামোগত সংকট ও জনদুর্ভোগের বিষয়গুলো জাতীয় সংসদে তুলে ধরার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সীতাকুণ্ড উপজেলা এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৯ ও ১০ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-৪ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৪৮ হাজার ৩৮০ জন। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, সীতাকুণ্ড উপজেলার জনসংখ্যা চার লাখের বেশি। সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট দুটি ওয়ার্ডে বাস করেন আরও দুই লাখের বেশি মানুষ। ভোটার, শিশু ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের হিসাবে আসনটির মোট জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে ছয় লাখ।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী আসলাম চৌধুরী ১ লাখ ৪২ হাজার ৬৭৪ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে জয়ী হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পান ৮৯ হাজার ২৬৮ ভোট।
তবে ঋণখেলাপি হওয়ার অভিযোগে নির্বাচনের আগেই আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে আপিল করেন আনোয়ার সিদ্দিকী। গত ৩ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ তাঁর লিভ টু আপিল মঞ্জুর করে আদেশ দেন, আসলাম চৌধুরী নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে সফল হলেও সংশ্লিষ্ট আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁর ক্ষেত্রে নির্বাচনের ফল প্রকাশ স্থগিত থাকবে।
এরপর ৩১ মার্চ পৃথক আপিল করেন আনোয়ার সিদ্দিকী। ২৮ এপ্রিল আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত আবেদনটি শুনানির জন্য নিয়মিত বেঞ্চে পাঠান। এদিকে আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বহাল রাখার হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে ব্যাংক এশিয়া পিএলসি ও যমুনা ব্যাংক পিএলসিও লিভ টু আপিল করে।
১০ জুন আপিল বিভাগ মামলার শুনানিতে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এম কামরুল হক সিদ্দিকী ও প্রবীর নিয়োগীর নাম ঘোষণা করেন। জামায়াতের প্রার্থীর পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন ও যায়েদ বিন আমজাদ।
আসলাম চৌধুরীর পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন ও মো. মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী রোকন উদ্দিন মো. ফারুক। ব্যাংক এশিয়ার পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কামাল উল আলম এবং যমুনা ব্যাংকের পক্ষে আইনজীবী এ এস এম শাহরিয়ার কবির শুনানি করেন।
শেষ পর্যন্ত গত ৩০ জুন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চ আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিলের রায় দেন।
রায়ের পর চট্টগ্রাম-৪ আসনে নতুন করে নির্বাচন হবে, নাকি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থীকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে—এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সমাধান পাওয়া যায়নি।
রায়ের পর এক ব্রিফিংয়ে আনোয়ার সিদ্দিকীর আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, ‘আসলাম চৌধুরী ঋণখেলাপি হিসেবে এই নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, আর নির্বাচনে তার এই অংশগ্রহণ অবৈধ ঘোষিত হয়েছে এই রায়ের মাধ্যমে। অর্থাৎ আসলাম চৌধুরী অযোগ্য প্রার্থী হলেন। অযোগ্য প্রার্থী হওয়ার পরে আসনটিতে (চট্টগ্রাম-৪) কী হবে, তা আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হলে বিস্তারিত জানা যাবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তবে কোনও আসনে প্রথম হওয়া ব্যক্তি অযোগ্য হলে সাধারণত দ্বিতীয় যিনি থাকেন (ভোটে দ্বিতীয় হওয়া) তাকে নির্বাচিত ঘোষণা করাটাই সাধারণ নিয়ম। কিন্তু এর বাইরেও আপিল বিভাগ বিশেষ কোনও নির্দেশনা দেন কি না, সে ব্যাপারটি পরিপূর্ণ রায় প্রকাশিত হলে জানা যাবে।’
অন্যদিকে, অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজলের মতে, আসনটিতে পুনর্নির্বাচন হলে আসলাম চৌধুরীর প্রার্থী হতে আইনগত বাধা থাকার কথা নয়। আপিল বিভাগের রায়ের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দেখুন, একজন ব্যক্তির একটি নির্দিষ্ট সময়ের অযোগ্যতা তো সারা জীবন থাকবে না। পূর্ববর্তী নির্বাচনে যে কারণে আপিলটি মঞ্জুর হলো তার (আসলাম চৌধুরী) নির্বাচিত হওয়া সত্ত্বেও, তিনি হয়তো সেই নির্বাচনের ফলাফলটি ভোগ করতে পারবেন না। পরবর্তী নির্বাচনের ক্ষেত্রে তিনি যদি সে অযোগ্যতা কাটিয়ে যোগ্য হন, তার তো নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে আইনগত কোনও বাধা থাকার কথা না।’
সীতাকুণ্ড উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমল কদর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে জয়ী হলেও আসলাম চৌধুরী সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিতে পারেননি। তাঁর বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির অভিযোগ থাকলেও আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যবসা করতে না পারা ও দীর্ঘদিন কারাভোগের বিষয় উল্লেখ করে তাঁকে সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
কমল কদর বলেন, এলাকার মানুষ আশা নিয়ে তাঁকে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু সংসদে প্রতিনিধি না থাকায় এলাকার সমস্যা, সম্ভাবনা ও উন্নয়ন নিয়ে কথা বলার সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। নির্বাচন হবে কি না, কিংবা কীভাবে সমস্যার সমাধান হবে, সে বিষয়েও নির্বাচন কমিশন কিছু জানায়নি।
সীতাকুণ্ড উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব কাজী মোহাম্মদ মহিউদ্দিনও জনপ্রতিনিধি না থাকায় এলাকার উন্নয়ন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, চট্টগ্রামের এই আসনে সংসদ সদস্য না থাকায় নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড অনেকটা থমকে আছে।
তাঁর প্রস্তাব, নির্বাচিত সংসদ সদস্য শপথ নিতে না পারা পর্যন্ত আসনটির জন্য একজন সমন্বয়ক জনপ্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। এমন কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি, যার কথা এলাকার সব পক্ষ শুনবে এবং যিনি স্থানীয় সমস্যা ও উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবেন।
নিজের প্রার্থিতা বাতিলের রায় নিয়ে বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আপিল বিভাগের রায়ের কপি এখনও হাতে পাইনি। রায়ের কপি হাতে পাওয়ার পর আমি রিভিউ করবো। আশা করছি ফলাফল আমার পক্ষেই আসবে।’
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন চৌধুরী জানান, চট্টগ্রাম-৪ আসন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে এখনো কোনো নির্দেশনা আসেনি। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন ও আদালত থেকে সে নির্দেশনা আসবে আমরা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।’
ফলে আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায়, আসলাম চৌধুরীর সম্ভাব্য রিভিউ এবং নির্বাচন কমিশনের পরবর্তী নির্দেশনার ওপর নির্ভর করছে চট্টগ্রাম-৪ আসনের সংসদীয় প্রতিনিধিত্বের ভবিষ্যৎ।