• হোম > আন্তর্জাতিক | ইউরোপ | বিদেশ > এআই ব্যবহারের কথা জানিয়েও ফ্রান্সের গোঙ্কুর পুরস্কার জিতলেন জেনাদা

এআই ব্যবহারের কথা জানিয়েও ফ্রান্সের গোঙ্কুর পুরস্কার জিতলেন জেনাদা

  • বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬, ১৬:০৩
  • ১৫

---

 

ইবি আন্তর্জাতিক ডেস্ক

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করেও ফ্রান্সের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কার গোঙ্কুর জিতেছেন লেখক ফিলিপ জেনাদা। তাঁর লেখা ‘ল্যাঁকোন্যু দু ক্য দ্য জাভেল’ (জাভেল ঘাটের অচেনা নারী) উপন্যাসের জন্য মঙ্গলবার এ স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বইটি যুদ্ধ-পরবর্তী প্যারিসে এক তরুণীর অমীমাংসিত হত্যাকাণ্ডের অনুসন্ধান নিয়ে লেখা।

৬২ বছর বয়সী জেনাদা নিজের বইয়ে চ্যাটজিপিটি ও ক্লডের সঙ্গে করা অনুসন্ধানমূলক কথোপকথনও যুক্ত করেছেন। এআই ব্যবহারের বিষয়টি তিনি গোপন করেননি। তাঁর এই স্বীকৃতি এমন এক সময়ে এল, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় লেখা তৈরি নিয়ে ফ্রান্সের সাহিত্য ও প্রকাশনা জগতে বিতর্ক চলছে।

নিজেকে পুরোনো ধাঁচের লেখক হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন জেনাদা। এমনকি তাঁর নিজের কোনো মুঠোফোনও নেই। তবে বইয়ের কাজে তিনি চ্যাটজিপিটি ও ক্লড ব্যবহার করেছেন। এআইয়ের সহায়তা নেওয়ার বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণের উদাহরণ টেনেছেন। তাঁর প্রশ্ন, কোনো চলচ্চিত্র পরিচালক কি বিশেষ দৃশ্য তৈরিতে প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা গোপন করবেন?

‘২০ মিনিটস’ পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জেনাদা বলেন, ‘খুব শিগগিরই আমরা আর কোনো লেখাকে শতভাগ মানুষের লেখা বলে দাবি করতে পারব না। এমন একটি উপন্যাসের কথাও সহজেই কল্পনা করা যায়, যার একটি অধ্যায় স্পষ্টভাবে চিহ্নিত থাকবে যে সেটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে লেখা হয়েছে।’

তবে সাহিত্যে মানুষের আবেগের জায়গা কোনো যন্ত্র নিতে পারবে না বলে মনে করেন তিনি। জেনাদার ভাষায়, ‘সংজ্ঞা অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কখনো মানুষ হতে পারবে না। এটি কখনো মানুষের হৃদয়, আত্মা, স্মৃতি এবং মানুষ ও পৃথিবীকে দেখার নিজস্ব অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে একটি বই লিখতে পারবে না।’

চলতি বছর গোঙ্কুর পুরস্কার ঘিরে এআই ব্যবহারের বিতর্ক শুরু হয় হাইতি বংশোদ্ভূত কানাডীয় লেখক থেলিসন ওরেলিয়েনকে কেন্দ্র করে। তাঁর ‘সেতে সা উ মুরির’ (হয় এমন, নয়তো মৃত্যু) বইটি প্রথম দিকে পুরস্কার জয়ের অন্যতম সম্ভাব্য দাবিদার ছিল। পরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের অভিযোগে বইটি গোঙ্কুর পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। অন্য সাহিত্য পুরস্কারের প্রতিযোগিতা থেকেও এটি প্রত্যাহার করা হয়।

এআই শনাক্তকারী একটি ব্যবস্থায় পরীক্ষা করে দেখা যায়, বইটির ৯৫ শতাংশের বেশি লেখা যন্ত্রের মাধ্যমে তৈরি হয়ে থাকতে পারে। তবে এ ধরনের শনাক্তকারী প্রযুক্তির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ওরেলিয়েন তাঁর উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অবশ্য আগের কিছু লেখায় অন্যের লেখা নকল করার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেছিলেন।

এই বিতর্কের পর পুরস্কারের বিধিমালা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে গোঙ্কুর একাডেমি। নতুন নিয়মে এআইয়ের সহায়তায় তৈরি সাহিত্যকর্ম পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হবে না।

একাডেমির সভাপতি ফিলিপ ক্লোদেল সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা নিয়ম পরিবর্তন করতে যাচ্ছি। বছরের শেষ নাগাদ গোঙ্কুর পুরস্কারের বিধিমালায় স্পষ্ট করা হবে, এই পুরস্কার কেবল মানুষের লেখা সাহিত্যকর্মকেই সম্মানিত করবে।’

প্রকাশনা সংস্থা গ্যালিমারের প্রধান আন্তোয়ান গ্যালিমারও এআই ব্যবহারের বিষয়টি স্বচ্ছভাবে প্রকাশের ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর মতে, কোনো বই তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হলে তা সহজভাবে ও সততার সঙ্গে জানানো উচিত।

প্যারিসের লে দ্রুয়াঁ রেস্তোরাঁর সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে পুরস্কার পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় জেনাদা বলেন, ‘আমার কাছে এটি একটি দীর্ঘ পথচলার পরিণতি। এটি আমার জন্য সম্মানের। আমি ভীষণ আনন্দিত।’ প্রতিবছর এই রেস্তোরাঁতেই গোঙ্কুর পুরস্কার ঘোষণা করা হয়।

অমীমাংসিত অপরাধের অনুসন্ধান নিয়ে লেখার জন্য পরিচিত জেনাদা। তাঁর বইয়ে পুরোনো নথিপত্রের তথ্যের পাশাপাশি ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনা ও স্মৃতিও উঠে আসে।

পুরস্কার পাওয়ার পর ব্যস্ত সময় কাটানোর প্রস্তুতি থাকলেও আবার লেখকের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান তিনি। সেই জীবনে আদালতের নথিপত্র ঘেঁটে অপরাধের অনুসন্ধান করাই তাঁর প্রধান কাজ।

এবার গোঙ্কুর একাডেমির নয় সদস্যের মধ্যে ছয়জন জেনাদাকে ভোট দিয়েছেন। বাকি তিনটি ভোট পেয়েছেন সিলভাঁ প্রুদম। তাঁর ‘দ্য লোত্র কোতে দ্যু লাক’ (হ্রদের অন্য পাড়ে) বইয়ে এক তরুণ আলোকচিত্রীর গল্প তুলে ধরা হয়েছে। গল্পে ওই আলোকচিত্রীকে উঁচু পাহাড়ের একটি প্রাকৃতিক সংরক্ষিত এলাকায় ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়।

জেনাদার পুরস্কারজয়ী বইয়ের কেন্দ্রীয় চরিত্র লুইজ কানসো। ২৯ বছর বয়সী এই নারী ফ্রান্সের ব্রিটানি অঞ্চলের বাসিন্দা ছিলেন। পরে প্যারিসে এসে মডেল হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৪৯ সালের সেপ্টেম্বরে সেইন নদীর তীরে তাঁর মরদেহ পাওয়া যায়। বইটিতে লেখক নিজেই হত্যাকাণ্ডের অনুসন্ধান করেছেন।

হত্যাকারীকে শনাক্ত করতে তিনি গোয়েন্দা কাহিনির জনপ্রিয় চরিত্র কমিশনার জুল মেগ্রের তদন্তপদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। জর্জ সিমেনঁর বিখ্যাত গোয়েন্দা উপন্যাসের এই চরিত্রের পদ্ধতি অনুসরণ করে জেনাদা পুলিশি নথিপত্র ঘেঁটেছেন এবং নিহত নারী যেখানে বসবাস করতেন, সেসব স্থানেও গেছেন।

ফরাসি সংবাদপত্র ‘ল্য মোঁদ’ বইটি নিয়ে লিখেছে, ‘ফিলিপ জেনাদার অন্য সব উপন্যাসের মতো এই বইটিও সময়ের প্রবাহ নিয়ে গভীরভাবে কথা বলেছে। এতে কয়েক দশক ধরে কী টিকে থাকে আর কী হারিয়ে যায়, তার হিসেব তুলে ধরা হয়েছে।’

এবারের পুরস্কারের দৌড়ে আরও ছিলেন ক্লেমন্তিন মেলোয়ার, তাঁর বই ‘শোজ ক্য জ্য ক্রোয়া পেদ্যু’ (যেসব জিনিস হারিয়ে গেছে বলে ভেবেছিলাম) এবং ইয়ানিক আনেল, তাঁর বই ‘লা সোলিতুদ দে প্রফেসরের এ আঁফিনি’ (শিক্ষকদের নিঃসঙ্গতার কোনো শেষ নেই)।

গোঙ্কুর পুরস্কারের আর্থিক মূল্য মাত্র ১০ ইউরো বা ৯ পাউন্ড। তবে এই স্বীকৃতি একজন লেখকের বইয়ের বিক্রি ও পেশাগত জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। গত বছরের বিজয়ী লরাঁ মোভিনিয়ের ‘লা মেজোঁ ভিদ’ (খালি বাড়ি) উপন্যাসটি প্রায় ছয় লাখ ৪০ হাজার কপি বিক্রি হয়েছিল।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/21164 ,   Print Date & Time: Wednesday, 4 November 2026, 12:00:03 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh