• হোম > অর্থনীতি | জাতীয় | বাংলাদেশ > বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপেও ডলারের বাজারে অস্থিরতা

বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপেও ডলারের বাজারে অস্থিরতা

  • বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬, ১২:২৪
  • ১২

---

 

ইবি রিপোর্ট

রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা ফেরানোর চেষ্টা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগের পরও টাকার বিপরীতে ডলারের দর ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো রেমিট্যান্স হাউসগুলোর কাছ থেকে প্রতি ডলার সর্বোচ্চ ১২৪ টাকা ৭০ পয়সা দরে কিনেছে। বাজারে দর বেশি থাকায় ১০ কোটি ডলার বিক্রির জন্য নিলাম আহ্বান করেও শেষ পর্যন্ত কোনো ডলার ছাড়েনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ব্যাংকারদের ভাষ্য, নিলামে ব্যাংকগুলো প্রতি ডলারের বিপরীতে ১২৪ টাকা ৩৫ পয়সা থেকে ১২৪ টাকা ৭৫ পয়সা পর্যন্ত দর প্রস্তাব করে। তাঁদের ধারণা, কাট-অফ রেট ১২৪ টাকা ৬০ পয়সা নির্ধারিত হতে পারত। কিন্তু ওই দরে ডলার বিক্রি করতে আগ্রহী ছিল না বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে সর্বশেষ প্রতি ডলার ১২৪ টাকা থেকে ১২৪ টাকা ৩০ পয়সা দরে রিজার্ভ থেকে বিক্রি করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

গত সপ্তাহে রিজার্ভ থেকে ১২ কোটি ২০ লাখ ডলার বাজারে সরবরাহ করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। ওই সময়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ডলারের চাহিদা ছিল প্রায় ৮০ কোটি ডলার। বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরবরাহ করে মাত্র ১২ কোটি ২০ লাখ ডলার। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান থেকেই যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, ডলারের দাম ১২৫ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়া ঠেকাতেই রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ব্যাংকারদের মতে, গত মাসে সরকারি খাতের বৈদেশিক মুদ্রায় বিল পরিশোধের চাপ বেড়ে যাওয়ায় বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও পেট্রোবাংলার বড় অঙ্কের বিল পরিশোধের কারণে গত এক মাস ধরে ডলারের দাম বাড়ছে। অথচ মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির প্রবৃদ্ধি বর্তমানে ঋণাত্মক।

গত আড়াই মাসে প্রতি ডলারের দাম বেড়েছে প্রায় ১ টাকা ৯০ পয়সা। আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে ডলারের দর ছিল ১২২ টাকা ৭০ পয়সা। মঙ্গলবার আমদানি ঋণপত্র (এলসি) নিষ্পত্তিতে প্রতি ডলারের দাম দাঁড়ায় ১২৪ টাকা ৮০ পয়সা। আগের দিন সোমবার এ দর ছিল ১২৪ টাকা ৫০ পয়সা।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, “রেমিট্যান্সের প্রবাহ আগের চেয়ে কমে গেছে। আবার রপ্তানি আয়ও আশানুরূপ নয়। তা ছাড়া সরকারি এলসির বিল পরিশোধের বাড়তি চাপ রয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ কম এবং পরিশোধের চাপ বেশি থাকায় ডলারের দাম বাড়ছে।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে। জুলাই-আগস্ট সময়ে এ খাতে ব্যয় হয়েছে ২৫০ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয় ছিল ১২৫ কোটি ডলার।

এর মধ্যে পেট্রোলিয়াম, অয়েল অ্যান্ড লুব্রিকেন্টস (পিওএল) আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ২২৮ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ ব্যয় ছিল ১০০ কোটি ডলার।

এদিকে সেপ্টেম্বরে ৮০০ কোটি ডলারের বেশি আমদানি ঋণপত্র খোলা হয়েছে। একই মাসে এলসি নিষ্পত্তি বা বিল পরিশোধের পরিমাণ ছিল ৬৫০ কোটি ডলারের বেশি। জ্বালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি ডলারের চাহিদায় বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় প্রত্যাশা অনুযায়ী আসছে না। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহের তুলনায় বিল পরিশোধের চাপ বেশি থাকছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আশঙ্কা করছেন, নভেম্বরেও রেমিট্যান্স প্রবাহ কম থাকলে ডলারের দাম আরও বাড়তে পারে। অক্টোবরে প্রবাসীরা ২৮৭ কোটি ডলার পাঠিয়েছেন।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে ৩ হাজার ৫৫০ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছে। তবে চলতি অর্থবছরের শুরুতে এ প্রবাহে কিছুটা মন্থরতা দেখা যাচ্ছে। সেপ্টেম্বরে প্রবাসীরা ২৭৭ কোটি ডলার পাঠিয়েছেন, যা ১১ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। অক্টোবরে তা বেড়ে ২৮৭ কোটি ডলারে পৌঁছালেও পরিমাণটি ৩০০ কোটি ডলারের নিচে রয়েছে। এর আগে ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত টানা ছয় মাস মাসিক রেমিট্যান্স ৩০০ কোটি ডলারের বেশি ছিল।

একাধিক বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্মকর্তারা টিবিএসকে বলেন, আগামী ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত জ্বালানি আমদানির বিল পরিশোধের চাপ থাকতে পারে। সরকারি এলসির বিল মেটানোর সময় ডলারের বাজারে বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়। এর সঙ্গে রেমিট্যান্স ৩০০ কোটি ডলারের নিচে থাকায় সরবরাহ পরিস্থিতিও চাপে পড়ছে।

একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, আগে ডলারের দাম কমার সময় বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনেছিল। কিন্তু এখন বিল পরিশোধের চাপ থাকায় চাহিদা অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার বিক্রি করা উচিত।

আরেক ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূলত টাকার আরও অবমূল্যায়ন ঠেকাতে চাইছে। তবে গত সপ্তাহে ১২ কোটি ২০ লাখ ডলার বিক্রির পরও বাজারে কার্যকর প্রভাব পড়েনি। বরং বিক্রির এক দিন পরই ডলারের দাম বেড়েছে। তাঁর মতে, ডলারের দাম কোন পর্যায়ে রাখতে চায়, সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও বিচক্ষণতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে বড় বাণিজ্য ঘাটতি থাকলেও রেমিট্যান্সের প্রবাহের কারণে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে চলতি হিসাবে ৫৯ কোটি ৯০ লাখ ডলার উদ্বৃত্ত হয়েছে। জুলাই-আগস্ট সময়ে রেমিট্যান্সে ১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি চলতি হিসাবের ভারসাম্য ইতিবাচক রাখতে ভূমিকা রেখেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে চলতি হিসাবের ভারসাম্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/21097 ,   Print Date & Time: Wednesday, 4 November 2026, 08:35:38 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh