![]()
ইবি রিপোর্ট
কুইক রেন্টালের নামে লুটপাটের পরিবর্তে সাশ্রয়ী উপায়ে দেশের বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ব্যয় এবং চুক্তি পর্যালোচনার পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা এবং সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে একযোগে কাজ করছে সরকার। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা যেন অর্থের অভাবে পিছিয়ে না পড়েন, সে বিষয়েও সরকার উদ্যোগ নিচ্ছে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে দুই দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ সোলার এক্সপো-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে আয়োজনের সূচনা হয়। বিদ্যুৎ বিভাগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল) যৌথভাবে প্রথমবারের মতো এ এক্সপোর আয়োজন করেছে। এবারের প্রতিপাদ্য ‘প্রতি ইঞ্চি ছাদ কাজে লাগাই, সৌরবিদ্যুতে আয় বাড়াই’।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতিতে জনগণের ভোগান্তি সম্পর্কে সরকার সচেতন। ফলে চলমান জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা, বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় ও চুক্তি পর্যালোচনা করা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা এবং দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ—এসব বিষয় নিয়ে সরকার একযোগে কাজ করছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বাত্মক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’
তিনি জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, দেশকে সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর করে ফেলার কারণে বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি আমদানির প্রক্রিয়া বিঘ্নিত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ৪৩ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে সরকার।
চলতি অর্থবছরেও বিদ্যুতের প্রায় সমপরিমাণ চাহিদা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সংকট মোকাবিলায় ডিজেলের মজুদ বাড়ানো হয়েছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য কয়লার সরবরাহ ও মজুদ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিকল্প সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগও অব্যাহত রয়েছে। জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ইতোমধ্যে ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য, অতীতের সরকারগুলোর ব্যর্থতা কিংবা বিদ্যুৎ উৎপাদনে তাদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনায় সময় ব্যয় না করে ভবিষ্যতে কীভাবে চাহিদা পূরণ করা যায়, বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়, সেটিই বর্তমান সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে অর্থায়ন সহজ করতে সরকার প্রাথমিকভাবে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার তহবিল বরাদ্দ করেছে। প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে আরও অর্থের সংস্থান করা হবে।
তিনি বলেন, ‘আপনারাই এ উদ্যোগের মূল চালিকাশক্তি। সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে অর্থায়ন সহজ করতে সরকার প্রাথমিকভাবে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার তহবিল বরাদ্দ করেছে। পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা হবে।’
তারেক রহমান আরও বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা যেন শুধু অর্থের অভাবে পিছিয়ে না পড়েন, সরকার তা নিশ্চিত করতে চায়। বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর কেবল সম্ভাবনাময় খাত নয়, বরং অনিবার্য বাস্তবতা।
তরুণদের উদ্ভাবনী উদ্যোগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, অনুষ্ঠানে নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ কয়েকটি বিষয়ে নতুন ধারণা উপস্থাপন করে কয়েকজন পুরস্কৃত হয়েছেন। আগামীতেও বাংলাদেশে জ্ঞান ও নতুন উদ্ভাবনী ধারণার প্রতিযোগিতা অব্যাহত থাকা প্রয়োজন। তাঁর মতে, একটি উদ্ভাবনী ধারণাও দেশের জন্য গেম চেঞ্জার হয়ে উঠতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অর্থের অভাবে যাতে তারুণ্যের কোনো উদ্ভাবনী আইডিয়া হারিয়ে না যায় সেটি নিশ্চিত করতে বর্তমান চলতি বাজেটে ‘স্টার্ট আপ’-এর জন্য বছরে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।’
সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ও সম্প্রসারণ সহজ করতে সরকার ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ ২০২৬’ প্রণয়ন করেছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। এ খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে বিভিন্ন নীতিগত সহায়তা, কর ও শুল্ক সুবিধা এবং আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে গ্রীষ্ম মৌসুম শুরুর আগেই জাতীয় গ্রিডে ৩ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করা সম্ভব হবে।
সরকারি-বেসরকারি অফিস, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং বাসাবাড়ির অব্যবহৃত ছাদ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে কাজে লাগানোর প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
নেট মিটারিং ব্যবস্থার আওতায় স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ সিস্টেম থেকে নিজস্ব ব্যবহারের পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যাবে। প্রধানমন্ত্রী জানান, ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে প্রণোদনাসহ প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে এ বিদ্যুৎ কিনবে সরকার।
নিজের বাসায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের কথাও তুলে ধরেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যেই অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের কাজ এগিয়ে চলেছে। আমি নিজেও আমার বাসায় সোলার প্যানেল স্থাপন করেছি। ইতোমধ্যেই আমার বাসায় ব্যবহারের পর বিদ্যুতের কিছু অতিরিক্ত ইউনিট জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতেও সক্ষম হয়েছি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সৌরবিদ্যুতের প্রসারে সরকারি ও বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়নের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রপাতির দাম কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ ব্যবহারের খরচ কমানোও সরকারের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে।
সৌরবিদ্যুৎ খাতের সেবা প্রদানকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, একটি ব্যবস্থা স্থাপনের পর সেটি ঠিকভাবে কাজ করছে কি না, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে কি না এবং গ্রাহকেরা প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং তাঁদের সমস্যা ও সম্ভাবনার বিষয়ে আন্তরিক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
কৃষিতেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের বড় সুযোগ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন সরকারপ্রধান। বর্তমানে কৃষকদের সেচের জন্য ভর্তুকি মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। তবে পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্পকে সৌরচালিত পাম্পে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমবে, পরিবেশ সংরক্ষিত হবে এবং জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বিদ্যুৎ ব্যবহারে জনগণের দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, জনগণের চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন সরকারের দায়িত্ব, আর বিদ্যুতের সঠিক ও সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করা সবার কর্তব্য। দিনের বেলায় প্রাকৃতিক আলো-বাতাস ব্যবহারের পাশাপাশি বাসা, অফিস ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অপ্রয়োজনে বাল্ব, ফ্যান এবং ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি বন্ধ রাখার অনুরোধ জানান তিনি।
বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে উন্নয়ন সহযোগীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, শুধু বড় প্রকল্প নয়, স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের উদ্যোগেও অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। এ খাতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্যও বিনিয়োগের সহজ সুযোগ রয়েছে।
সরকার, উদ্যোক্তা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী ও সাধারণ মানুষ সম্মিলিতভাবে কাজ করলে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি। বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আসুন, আমরা সূর্যের আলোকে দেশের সম্পদে পরিণত করি। বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তুলি।’
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ‘স্ফুরণ: টেকসই জ্বালানি উদ্ভাবনের খোঁজে ২০২৬’ প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন। পরে তাঁদের সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেন তিনি। এর আগে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা নিয়ে একটি ভিডিওচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, অর্থসচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মিরানা মাহরুখ। এ ছাড়া সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।