![]()
ইবি রিপোর্ট
শরীরে কোনো লক্ষণ ছাড়াই যকৃতে জমতে পারে অতিরিক্ত চর্বি। সময়মতো জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন না আনলে এই সমস্যা থেকে দেখা দিতে পারে প্রদাহ, এমনকি পরবর্তী সময়ে সিরোসিস ও ক্যানসারের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। তাই ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণে ওজন কমানোর পাশাপাশি প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় রাখতে হবে পুষ্টিকর কিছু উপাদান। সবুজ শাকসবজি থেকে শুরু করে সামুদ্রিক মাছ, আখরোট ও বিট—কিছু খাবার যকৃতের কার্যকারিতা ভালো রাখতে সহায়তা করতে পারে।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ফ্যাটি লিভার একটি পরিচিত স্বাস্থ্যসমস্যা। শুধু বয়স্ক ব্যক্তিরাই নন, অল্প বয়সীদের মধ্যেও এই রোগের উপস্থিতি বাড়ছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যকৃতে প্রদাহ দেখা দিতে পারে। দীর্ঘদিন প্রদাহ চলতে থাকলে পরবর্তী সময়ে সিরোসিস কিংবা ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হেপাটাইটিস ভাইরাসের কারণে হওয়া লিভার সিরোসিসের তুলনায় ফ্যাটি লিভারজনিত সিরোসিসের হার বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আগামী দিনে এই সমস্যা আরও বিস্তৃত হতে পারে।
বাংলাদেশে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ বেশি দেখা যায়। স্থূলতা, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এই সমস্যার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে। অতিরিক্ত ওজন, ডায়াবেটিস, রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের উচ্চমাত্রা, ভালো কোলেস্টেরল বা এইচডিএল কম থাকা এবং কার্বোহাইড্রেট ও চর্বির বিপাকে সমস্যা দেখা দিলে যকৃতে চর্বি জমতে পারে।
এই রোগ নিয়ন্ত্রণে নির্দিষ্ট কোনো ওষুধের ওপর নির্ভর করার পরিবর্তে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত ব্যায়াম—এই তিনটি বিষয় ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। এর মধ্যে খাবারের ধরন ও পরিমাণের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া দরকার। যকৃতের সুস্থতা বজায় রাখতে খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন নিচের আটটি খাবার।
১. সবুজ শাকসবজি
সবুজ পাতাওয়ালা শাকসবজিতে থাকা পলিফেনল ও নাইট্রেট যকৃতে জমে থাকা চর্বি কমাতে সহায়তা করতে পারে। তবে অতিরিক্ত রান্না বা সেদ্ধ করার ফলে এসব উপাদানের পরিমাণ এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। তাই শাক, লেটুসসহ বিভিন্ন সবুজ পাতা সালাদ হিসেবে কাঁচা খাওয়া যেতে পারে। সেদ্ধ করলে সেই পানি ফেলে না দেওয়াই ভালো।
২. ডাল ও বীজজাতীয় খাবার
ডাল, ছোলা ও মটরশুঁটিতে প্রচুর আঁশ ও স্টার্চ রয়েছে। এসব খাবার পরিপাকতন্ত্রের জন্য উপকারী এবং রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা কমাতে সহায়তা করে। পাশাপাশি সয়াপ্রোটিন ও টফুও খাদ্যতালিকায় রাখা যায়। সয়াতে থাকা বিটা কনগ্লাইসিন ট্রাইগ্লিসারাইড ও ভিসেরাল ফ্যাট কমাতে সাহায্য করে। সূর্যমুখীর বীজে থাকা ভিটামিন ই-ও ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে উপকারী।
৩. সামুদ্রিক মাছ
ইলিশ, রূপচাঁদা, টুনা, স্যামন ও সার্ডিনের মতো মাছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড রয়েছে। এসব মাছ উপকারী এইচডিএল কোলেস্টেরল বাড়াতে এবং ক্ষতিকর ট্রাইগ্লিসারাইড কমাতে সহায়তা করে। একই সঙ্গে যকৃতের চর্বি ও প্রদাহ কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, সপ্তাহে অন্তত তিন দিন মাছ খাওয়া উচিত।
৪. ওটস ও জটিল শর্করা
ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণে সাধারণ শর্করার পরিবর্তে জটিল শর্করাজাতীয় খাবার বেছে নেওয়া ভালো। এ ক্ষেত্রে ওটমিল, লাল আটার রুটি ও যবের রুটি খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। এসব খাবার সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখতে সহায়তা করে।
৫. আখরোট
আখরোটে রয়েছে গ্লুটাথিয়ন, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড ও আরজিনিন। এসব উপাদান যকৃতের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সহায়তা করে। পাশাপাশি শরীর থেকে ক্ষতিকর অ্যামোনিয়া ও বিষাক্ত বর্জ্য অপসারণেও ভূমিকা রাখে। যকৃতের প্রদাহ এবং অতিরিক্ত চর্বি কমাতেও আখরোট উপকারী হতে পারে। প্রতিদিন সকালে ভেজানো অথবা শুকনো ৪–৫টি আখরোট খাওয়া যেতে পারে। তবে এর বেশি না খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
৬. বিট
বিটে রয়েছে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, আঁশ ও নাইট্রেট। এসব উপাদান পিত্তরস উৎপাদনে সহায়তা করে এবং শরীরের বিভিন্ন উৎসেচকের কার্যকারিতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি অক্সিডেটিভ স্ট্রেস প্রতিরোধে সাহায্য করে, যা যকৃতের সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়ক।
৭. লেবু ও ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল
আমলকি, পেয়ারা ও লেবুর মতো ফলে প্রচুর ভিটামিন সি পাওয়া যায়। এসব ফল শরীর থেকে দূষিত পদার্থ বের করে দিতে সহায়তা করে। পাশাপাশি যকৃতের বিষাক্ত উপাদান অপসারণের প্রক্রিয়াতেও ভূমিকা রাখে। তাই প্রতিদিনের খাবারে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল রাখা যেতে পারে।
৮. মসলা
রান্নায় ব্যবহৃত কিছু মসলাও যকৃতের যত্নে সহায়ক হতে পারে। কাঁচা হলুদে থাকা কারকিউমিন এবং কাঁচা রসুন যকৃতের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে বলে গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাই পরিমিত পরিমাণে এসব উপাদান খাবারে যুক্ত করা যেতে পারে।