![]()
ইবি রিপোর্ট
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতায় শুধু বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে থাকতে চায় না বাংলাদেশ। নিজস্ব গবেষণা, বাংলা ভাষাভিত্তিক লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম), দক্ষ জনবল এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামো তৈরির মাধ্যমে এ খাতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে আগামী ১২ মাসের মধ্যে সার্বভৌম এআই অবকাঠামো চালুর প্রস্তুতি চলছে। পাশাপাশি ডেটা সেন্টার, সেমিকন্ডাক্টর ও প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগও সামনে আসছে।
প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ জানিয়েছেন, আগামী বছরের মধ্যে বাংলাদেশে নিজস্ব সার্বভৌম এআই অবকাঠামো চালু করা হবে। প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং চিপ ও মেমোরি মডিউল সংগ্রহের ব্যবস্থাও নিশ্চিত হয়েছে। প্রস্তাবিত অবকাঠামো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্টার্টআপ, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
এর ফলে দেশীয় প্রযুক্তিবিদরা বাংলা ভাষার নিজস্ব এলএলএম তৈরি এবং এআইনির্ভর নতুন সেবা উদ্ভাবনের সুযোগ পাবেন। বর্তমানে উন্নত এআই মডেল তৈরি ও পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চক্ষমতার জিপিইউ, কম্পিউটিং সুবিধা, তথ্যভাণ্ডার এবং গবেষণার সুযোগ সীমিত। এ কারণে বিদেশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মডেল ও ক্লাউড সেবার ওপর নির্ভরতা রয়েছে।
রেহান আসিফ আসাদের ভাষ্য অনুযায়ী, শুরুতেই বড় পরিসরের এআই কেন্দ্র নির্মাণের পরিবর্তে ছোট ও মডিউলার অবকাঠামো তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। বেসরকারি খাতের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও এতে নিজেদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যুক্ত করতে পারবে। উন্নত জিপিইউ সংগ্রহের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে।
এদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সেমিকন্ডাক্টর খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা দেখছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। সংস্থাটির নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন (আশিক চৌধুরী) প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প এবং উচ্চমূল্য সংযোজনকারী উৎপাদন খাত সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
তাঁর মতে, সেমিকন্ডাক্টর খাতে বিনিয়োগের সুযোগ থাকলেও তৈরি পোশাকশিল্পের মতো ব্যাপক কর্মসংস্থান এখানে তৈরি হবে না। বরং প্রযুক্তিগত দক্ষতা, উচ্চমূল্যের উৎপাদন এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ বেশি থাকবে। ডেটা সেন্টার, ক্লাউড কম্পিউটিং, চিপ ডিজাইন, সাইবার নিরাপত্তা ও সফটওয়্যার উন্নয়নেও বিনিয়োগের ক্ষেত্র রয়েছে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চের (সিএসইআর) চেয়ারম্যান ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম মনে করেন, বাংলাদেশকে প্রযুক্তি ব্যবহারকারীর পাশাপাশি প্রযুক্তি নির্মাতার ভূমিকায় যেতে হবে। তাঁর মতে, বিদেশি সফটওয়্যার ও এআই মডেল তাৎক্ষণিক সুবিধা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক মূল্য তৈরির জন্য নিজস্ব গবেষণা, তথ্যভাণ্ডার ও দক্ষ মানবসম্পদ প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের কৃষি, জলবায়ু, জনসংখ্যা ও ভাষাগত বাস্তবতা উন্নত দেশগুলোর তুলনায় আলাদা। তাই বিদেশে তৈরি প্রযুক্তি দিয়ে সব স্থানীয় সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। আকস্মিক বন্যার পূর্বাভাস, কৃষকদের আবহাওয়াভিত্তিক পরামর্শ, নগরীর যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং পোশাকশিল্পের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে দেশের নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে এআই তৈরি করতে হবে।
বিশেষ করে প্রমিত বাংলার পাশাপাশি আঞ্চলিক ভাষা ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট বুঝতে সক্ষম এআই তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। এ জন্য মানসম্মত বাংলা ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার, ভাষা প্রক্রিয়াকরণ গবেষণা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন।
সাকিফ শামীমের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন। যৌথ গবেষণা, প্রযুক্তি স্থানান্তর, গবেষণায় অর্থায়ন এবং মেধাস্বত্ব সুরক্ষার পাশাপাশি এআই, ডেটা সায়েন্স, মেশিন লার্নিং, রোবটিক্স ও সাইবার নিরাপত্তায় ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে।
এআইয়ের ব্যবহার ব্যাংকিং, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, শিক্ষা, তৈরি পোশাক, পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থায় বিস্তৃত হলে উৎপাদনশীলতা এবং সেবার মান বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বিদেশি প্রযুক্তি গ্রহণের পাশাপাশি দেশীয় উদ্ভাবন, গবেষণা ও বিনিয়োগের ভিত্তি শক্তিশালী করতে হবে।