![]()
ইবি রিপোর্ট
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও ন্যায্য অর্থায়ন নিশ্চিত করতে বহির্বিশ্বের সঙ্গে কাজ করছে সরকার। একই সঙ্গে দেশের জ্বালানি খাতে পরিবর্তন এনে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো এবং পরিবেশবান্ধব পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তাঁর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন।
রোববার (১ নভেম্বর) সকালে রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘সায়েন্স পলিসি ডায়লগ অন ব্ল্যাক কার্বন অ্যান্ড আদার শর্ট লাইভড ক্লাইমেট পল্যুটেন্টস’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।
মাহ্দী আমিন বলেন, বিদ্যমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং পরিবেশ সুরক্ষায় জ্বালানি খাতে বহুমুখী পরিবর্তন আনা হচ্ছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে সৌরবিদ্যুৎকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক ও সরকারি ভবনে সৌরশক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। পাশাপাশি বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। পরিবহন খাতে কার্বন নিঃসরণ কমাতে বিশেষ নীতিসহায়তার মাধ্যমে বৈদ্যুতিক ও পরিবেশবান্ধব যানবাহন ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান নগণ্য হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।
এ পরিস্থিতিতে ক্ষতিপূরণ তহবিল বা ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’ কার্যকর করা এবং পর্যাপ্ত জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। এ লক্ষ্যেই উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে সমতা ও মর্যাদার ভিত্তিতে কাজ করছে সরকার।
উন্নয়ন কার্যক্রমে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার ওপর জোর দিয়ে মাহ্দী আমিন বলেন, উন্নয়নের নামে কোনোভাবেই প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করা যাবে না। অতীতে মেগাপ্রকল্পের নামে পরিবেশের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তা থেকে অবিলম্বে সরে আসতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নির্মল বাতাস ও বাসযোগ্য দেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।
তিনি জানান, শিল্প খাতকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে রূপান্তরের পাশাপাশি ‘গ্রিন ইন্ডাস্ট্রি’ ও ‘লিড সার্টিফিকেশন’-এর আওতা বাড়ানোর কাজ চলছে। একই সঙ্গে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশের অভ্যন্তরে গ্যাসকূপ খনন এবং বিকল্প জ্বালানির কার্যকর ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে।
পরিবেশ সুরক্ষায় শুধু সরকারি নীতিমালা যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে তিনি গবেষক ও শিক্ষাবিদদের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণা এবং জ্ঞান বিনিময় কার্যক্রম ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারণের কথা জানান তিনি। এ ক্ষেত্রে সরকার সর্বোচ্চ নীতিগত সহায়তা দেবে বলেও আশ্বাস দেন।
তরুণ শিক্ষার্থীদের পরিবেশবান্ধব নতুন ধারণা ও উদ্ভাবনী স্টার্টআপ নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, পরিবেশ রক্ষা ও জাতীয় স্বার্থে শিক্ষার্থীদের কার্যকর উদ্যোগ এবং গবেষণায় সরকার সব সময় সর্বোচ্চ পৃষ্ঠপোষকতা দেবে।
পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা নিয়ে বিএনপির দীর্ঘদিনের নীতিগত অবস্থানের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সিএনজিচালিত যানবাহন চালু, ক্ষতিকর পলিথিন ও প্লাস্টিক নিষিদ্ধ এবং পাটজাত পরিবেশবান্ধব পণ্যের প্রসারে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
তাঁর ভাষ্য, বিএনপি সরকারের সময়ে দেশজুড়ে সপ্তাহ, মাস ও বছরব্যাপী বৃক্ষমেলার আয়োজন এবং সামাজিক বনায়নের যে ধারা তৈরি হয়েছিল, বর্তমান সরকার তা আরও বড় পরিসরে পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা নিয়েছে।
সরকারের পরিবেশবিষয়ক কর্মসূচির অগ্রগতি তুলে ধরে মাহ্দী আমিন বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী পরিবেশ সুরক্ষায় সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছেন। এর অংশ হিসেবে দেশজুড়ে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন এবং পুনঃখননের কর্মসূচি শুরু হয়েছে।
আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বনায়ন কার্যক্রম চলছে।
ভূগর্ভস্থ পানির অপচয় রোধ এবং সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে ‘পদ্মা ব্যারেজ’ ও ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নেও সরকার পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা।
গবেষণা, উদ্ভাবন এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংকটের সমাধানে নতুন বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, পরিবেশ সুরক্ষায় বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যৌথ অংশীদারিত্বকে সরকার স্বাগত জানায়। পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এখন জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয়।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধিদলে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, বিশ্বনেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন পার্শ্ববৈঠকেও বাংলাদেশ পরিবেশগত সহনশীলতা ও জলবায়ু সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছে। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকর নীতি প্রণয়ন এবং দীর্ঘস্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করার বিষয়েও বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে।
সেমিনারে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুল-আওয়াল এবং সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক আব্দুস সালাম এবং স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ওরজান গুসটাফসোন।