• হোম > অর্থনীতি | জাতীয় | দেশজুড়ে > সৌদি আরবে বছরে ১০ লাখ টন সার উৎপাদনের কারখানা করতে চায় সরকার

সৌদি আরবে বছরে ১০ লাখ টন সার উৎপাদনের কারখানা করতে চায় সরকার

  • রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬, ১৬:৫০
  • ১২

---

ইবি রিপোর্ট

ডিএপি সারের দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সৌদি আরবে কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করছে সরকার। যৌথ উদ্যোগে প্রস্তাবিত এ কারখানায় বছরে ১০ লাখ টন সার উৎপাদনের সক্ষমতা রাখার কথা রয়েছে। এতে আমদানির একাধিক উৎসের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে সার সংগ্রহের নিশ্চয়তা পাওয়ার আশা করছে বাংলাদেশ।

পররাষ্ট্র ও শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ও সৌদি আরব সরকারের সমান মালিকানায় একটি কোম্পানি গঠন করে কারখানাটি পরিচালনার প্রস্তাব রয়েছে। কোম্পানিটির দুই দেশেরই ৫০ শতাংশ করে মালিকানা থাকবে। উৎপাদিত সব সার ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে কিনে নেওয়ার নিশ্চয়তা দেবে বাংলাদেশ। অন্যদিকে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করবে সৌদি আরব।

প্রকল্পের মোট বিনিয়োগের ৩০ শতাংশ দুই দেশের সরকার সমানভাবে বহন করবে। বাকি ৭০ শতাংশ অর্থায়নের জন্য সৌদি আরবের আর্থিক খাত থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সব প্রক্রিয়া এগোলে ২০৩০ সালে কারখানাটির বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হতে পারে।

নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সৌদি আরব সফরে এ বিষয়ে একটি নন-বাইন্ডিং সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সইয়ের প্রস্তুতি চলছে। তবে প্রকল্পটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) টেলিফোনে তিনি বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) এ বিষয়ে কাজ করছে।

প্রকল্পটির কারিগরি ও বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে টেকনো-ইকোনমিক স্টাডি করার প্রস্তাব রয়েছে। প্রস্তাবিত এমওইউটি বাধ্যতামূলক হবে না। অর্থাৎ এটি স্বাক্ষরের মাধ্যমে কোনো পক্ষের ওপর প্রকল্প বাস্তবায়নের আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে না।

আমদানিনির্ভরতা কমানো ও সরবরাহ নিশ্চিতের উদ্যোগ

বাংলাদেশে ডিএপি সার উৎপাদনের একমাত্র কারখানাটি চাহিদার তুলনায় সীমিত পরিমাণ সার উৎপাদন করে। কাঁচামালের সংকটে অনেক সময় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হয়। ফলে দেশের চাহিদার বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। এই আমদানির উল্লেখযোগ্য অংশ আসে সৌদি আরব থেকে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সৌদি আরবে যৌথ উদ্যোগে কারখানা স্থাপন করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে ডিএপি সারের সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বর্তমান আমদানি দরের তুলনায় কম খরচে সার পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশে বছরে ১৪ থেকে ১৫ লাখ টন ডিএপি সারের প্রয়োজন হয়। এর বাইরে নিরাপত্তা মজুত হিসেবে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) কাছে ৫ লাখ টন রাখতে হয়। সব মিলিয়ে বার্ষিক চাহিদা দাঁড়ায় ১৯ থেকে ২০ লাখ টন।

এই চাহিদার বিপরীতে বেসরকারি খাতে প্রায় ৫ লাখ টন সার আমদানি করা হয়। বিসিআইসির উৎপাদনও প্রয়োজনের তুলনায় কম। বাকি সার সরকারি পর্যায়ে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) চুক্তি এবং উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বিএডিসি আমদানি করে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রাক্কলন বলছে, আগামী বছরগুলোতে বিএডিসিকে বছরে ৯ লাখ ৪০ হাজার থেকে ১০ লাখ টন ডিএপি সার আমদানি করতে হতে পারে। সৌদি আরবের প্রস্তাবিত কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা এই পরিমাণের কাছাকাছি। ফলে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে আমদানির বড় একটি অংশ দীর্ঘমেয়াদি নির্দিষ্ট উৎস থেকে সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয় উৎপাদিত সার কেনার নিশ্চয়তা বা ‘বাই-ব্যাক গ্যারান্টি’ দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক মত দিয়েছে।

সমান মালিকানা ও অর্থায়নের কাঠামো

প্রস্তাব অনুযায়ী, সৌদি আরবে নিবন্ধিত একটি যৌথ কোম্পানি কারখানাটি পরিচালনা করবে। কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে দুই দেশের সমানসংখ্যক প্রতিনিধি রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষে মালিকানায় অংশ নেবে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বিসিআইসি। বর্তমানে দেশের আটটি সরকারি সার কারখানা এ সংস্থার অধীনে রয়েছে।

কারখানা নির্মাণের সম্ভাব্য ব্যয় এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। সম্ভাব্যতা সমীক্ষার মাধ্যমে প্রকল্পের মোট খরচ, অর্থায়ন এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক শর্ত চূড়ান্ত করার কথা রয়েছে। আলোচনার ভিত্তিতে বাংলাদেশের সার কেনার নিশ্চয়তার মেয়াদ ২০ থেকে ২৫ বছর হতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদি ক্রেতা নিশ্চিত থাকলে সৌদি আরবের বিনিয়োগে আগ্রহ তৈরির সুযোগ রয়েছে। তবে প্রকল্পের আর্থিক কার্যকারিতা ও উৎপাদন ব্যয় সমীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর সফরে সমঝোতা স্মারকের প্রস্তুতি

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পশ্চিম এশিয়া অনুবিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নভেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সৌদি আরব সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সফরের তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি কনসেপ্ট নোট তৈরি করেছে। এ বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের মতামত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ ডিএপি সারের চাহিদা, আমদানির হিসাব এবং উৎপাদিত সার কেনার নিশ্চয়তা নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাছে মতামত চাওয়া হয়েছে।

এমওইউ সইয়ের পর দুই দেশ কারিগরি ও বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা যাচাই করবে। সমীক্ষা ও আলোচনার ফল ইতিবাচক হলে বিনিয়োগ, অর্থায়ন, কাঁচামাল সরবরাহ এবং সার কেনার শর্ত চূড়ান্ত করে পরবর্তী চুক্তি করা হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তার মতে, প্রস্তাবটি সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০-এর লক্ষ্যগুলোর সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই পরিকল্পনার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি বাড়ানো।

সৌদি আরবের সঙ্গে দীর্ঘদিনের আমদানি সম্পর্ক

কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে সৌদি আরবের সঙ্গে জিটুজি চুক্তিতে ডিএপি সার আমদানি করছে বাংলাদেশ। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর দুই বছরের জন্য নতুন চুক্তি করা হয়। এতে বছরে ১৫ লট সার নেওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে ১১টি নিশ্চিত এবং চারটি ঐচ্ছিক লট।

নিশ্চিত লট অনুযায়ী, প্রতি বছর সৌদি আরব থেকে অন্তত ৪ লাখ ৪০ হাজার টন ডিএপি সার আমদানি করতে হবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের সার আমদানির পরিমাণও বেড়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১২ লাখ ৭২ হাজার টন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৩ লাখ ৯৯ হাজার টন এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১৬ লাখ ২০ হাজার টন ডিএপি সার আমদানি করা হয়েছে।

নতুন কারখানা চালু হলে আমদানির এই বাজারের একটি অংশ যৌথ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন থেকে পূরণ করা যাবে। তবে বিদ্যমান জিটুজি চুক্তি, ভবিষ্যৎ চাহিদা ও কারখানার উৎপাদন সক্ষমতার মধ্যে সমন্বয় কীভাবে হবে, তা চূড়ান্ত পরিকল্পনায় নির্ধারণ করতে হবে।

আমদানি ব্যয় ও সরকারি ভর্তুকির চাপ

বর্তমানে গ্রাহক পর্যায়ে প্রতি কেজি ডিএপি সারের দাম ২১ টাকা। আমদানি খরচ ও বিক্রয়মূল্যের ব্যবধান পূরণে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয়।

গত ১৩ অক্টোবর সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি সৌদি আরব থেকে জিটুজি চুক্তির আওতায় ৪০ হাজার টন ডিএপি সার আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন করে। প্রতি টনের ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৮৬১ দশমিক ৫০ মার্কিন ডলার। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা হিসাবে প্রতি কেজির আমদানি মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১০৬ টাকা। এর সঙ্গে পরিবহন, হ্যান্ডলিং ও অন্যান্য খরচ যুক্ত হলে ব্যয় আরও বাড়তে পারে।

এ অবস্থায় সৌদি আরবে যৌথ কারখানা স্থাপন করে তুলনামূলক কম খরচে সার সংগ্রহের সম্ভাবনা যাচাই করতে চায় সরকার। তবে উৎপাদন ব্যয়, ঋণের সুদ, কাঁচামালের দাম, পরিবহন খরচ এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্রয় নিশ্চয়তার আর্থিক প্রভাব পর্যালোচনা ছাড়া প্রকল্পটি কতটা সাশ্রয়ী হবে, তা নিশ্চিত নয়।

দেশের একমাত্র কারখানায় উৎপাদন সক্ষমতার ব্যবহার কম

চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার রাঙ্গাদিয়ায় ৬৬ একর জমিতে ২০০৬ সালে ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (ডিএপিএফসিএল) প্রতিষ্ঠা করা হয়। দেশের একমাত্র ডিএপি সার উৎপাদনকারী এ কারখানার বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৫ লাখ ২৮ হাজার টন।

তবে কাঁচামালের সংকটে কারখানাটি পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এখানে ১ লাখ টন সার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। বাস্তবে উৎপাদন হয়েছে মাত্র ৪০ হাজার টন। চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত কোনো সার উৎপাদন হয়নি।

গত ২৮ জুন থেকে প্রধান কাঁচামাল ফসফরিক অ্যাসিডের অভাবে কারখানাটির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। প্রস্তাবিত সৌদি কারখানায় এ ধরনের সমস্যা এড়াতে কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিদেশে সরকারের সম্ভাব্য প্রথম শিল্প বিনিয়োগ

বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্র অনুযায়ী, দেশের বাইরে কোনো শিল্পকারখানায় সরকারের সরাসরি বিনিয়োগের নজির নেই। সৌদি আরবে প্রস্তাবিত প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হলে তা হবে এ ধরনের প্রথম উদ্যোগ।

বিদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতিমালা অনুসরণ করতে হয়। নীতিমালা অনুযায়ী, ১০ হাজার ডলারের বেশি বিনিয়োগের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন প্রয়োজন।

তাই প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, সরকারি বিনিয়োগের অনুমোদন, ঋণের দায়, সম্ভাব্য মুনাফা-লোকসান এবং দীর্ঘমেয়াদি সার কেনার নিশ্চয়তার আর্থিক প্রভাব বিবেচনা করতে হবে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও দুই দেশের আলোচনার ভিত্তিতেই শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগ কাঠামো এবং বাস্তবায়নপদ্ধতি নির্ধারিত হবে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/20836 ,   Print Date & Time: Sunday, 1 November 2026, 12:44:08 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh