• হোম > অর্থনীতি | জাতীয় | দেশজুড়ে > রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের অর্ধেক ২০ গ্রাহকের কাছে, আদায় মাত্র ৪ কোটি

রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের অর্ধেক ২০ গ্রাহকের কাছে, আদায় মাত্র ৪ কোটি

  • রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬, ১৬:৩৩
  • ১৪

---

ইবি রিপোর্ট

রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের আর্থিক সংকট আরও গভীর হচ্ছে খেলাপি ঋণ আদায়ে ধীরগতির কারণে। ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণের প্রায় অর্ধেক আটকে রয়েছে মাত্র ২০ ঋণগ্রহীতার কাছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাংকটির পাওনা ৯ হাজার ৮৫৯ কোটি টাকা। অথচ চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে আদায় হয়েছে মাত্র ৪ কোটি ৩ লাখ টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারভাইজরি ডাটা ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড অ্যানালিটিক্স ডিপার্টমেন্টের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুনে রূপালী ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৮০৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। বিতরণ করা মোট অনাদায়ী ঋণের ৩৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। একই সময়ে ব্যাংকটির প্রকৃত মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ২৬ কোটি টাকা।

শীর্ষ খেলাপিদের কাছ থেকে ঋণ আদায়ের পরিসংখ্যানেও বড় ওঠানামা দেখা গেছে। ২০২৪ সালে এসব গ্রাহকের কাছ থেকে ৪৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা আদায় হয়েছিল। ২০২৫ সালে আদায়ের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬১ কোটি টাকা। তবে ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে আদায় কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ কোটি ৩ লাখ টাকা।

সামগ্রিক খেলাপি ঋণ থেকে ২০২৪ সালে ৩৮১ কোটি টাকা আদায় করেছিল ব্যাংকটি। ২০২৫ সালে আদায় হয়েছিল ১ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত আদায় হয়েছে ৩৩০ কোটি টাকা। অথচ পুরো বছরে ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ব্যাংকটি।

শীর্ষ খেলাপিদের তালিকায় বেক্সিমকো

রূপালী ব্যাংকের শীর্ষ ২০ খেলাপির তালিকায় প্রথম অবস্থানে রয়েছে বেক্সিমকো গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির কাছে ব্যাংকের অনাদায়ী ঋণ ৯৯৪ কোটি টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের কাছে পাওনা ৯০৮ কোটি টাকা।

নারায়ণগঞ্জের ক্রোনী গ্রুপের কাছে আটকে আছে ৮৭২ কোটি টাকা। খুলনার জুট টেক্সটাইল মিলসের কাছে ৭২৪ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। চট্টগ্রামের নূরজাহান গ্রুপ ও এইচ এস কম্পোজিটের কাছে যথাক্রমে ৬৩০ ও ৬২০ কোটি টাকা আটকে আছে।

এ ছাড়া মাদারীপুর স্পিনিং মিলসের কাছে ৬১৮ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। ব্লু প্লানেট গ্রুপের বদর স্পিনিং মিলসের কাছে আটকে আছে ৬০৪ কোটি টাকা। ডলি কনস্ট্রাকশন ও সাত্তার গ্রুপের কাছে যথাক্রমে ৫০৬ ও ৪০৩ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে।

বেনিটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজের কাছে ৩৭১ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ রয়েছে। খুলনার ক্রিসেন্ট জুট মিলের কাছে আটকে আছে ৩২৫ কোটি টাকা। এস আলম গ্রুপের গ্লোবাল ট্রেডিং কর্পোরেশন ও সোনালী ট্রেডার্সের কাছে পাওনা ৩১৬ কোটি টাকা।

বসুন্ধরা গ্রুপের দুটি প্রতিষ্ঠানের কাছে আটকে রয়েছে ৩০৯ কোটি টাকা। থার্মেক্স গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের কাছে পাওনা ৩০২ কোটি টাকা। গ্যালকো স্টীলের কাছে ২৮৭ কোটি এবং ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কাছে ২৮৫ কোটি টাকা রয়েছে।

এ ছাড়া বেঙ্গল লেদারের কাছে ২৭৫ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। জাপান বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ পেপারের কাছে আটকে আছে ২৭০ কোটি টাকা। ভার্গো মিডিয়ার কাছে ব্যাংকটির পাওনা ২৪০ কোটি টাকা।

তবে ব্যাংকটি বাংলাদেশ ব্যাংককে জানিয়েছে, চারটি প্রতিষ্ঠান পুনঃতফসিলের মাধ্যমে খেলাপি অবস্থা থেকে বের হয়েছে। এগুলো হলো বসুন্ধরা পেপার মিল, ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ, বেনিটেক্স ও জুট টেক্সটাইল মিলস।

অবলোপন ও মামলায় আটকে বিপুল অর্থ

খেলাপি ঋণ আদায়ের পাশাপাশি ঋণ অবলোপনও অব্যাহত রেখেছে রূপালী ব্যাংক। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ৪৯০ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ অবলোপন করা হয়েছে। ২০২৪ সালে ৫১৮ কোটি এবং ২০২৫ সালে ৪৯৪ কোটি টাকা অবলোপন হয়েছিল।

অবলোপনের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ ব্যাংকের মূল হিসাব থেকে সরিয়ে রাখা হয়। তবে অবলোপন করা ঋণ থেকেও আদায় আশানুরূপ নয়। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে আদায় হয়েছে মাত্র ৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে আদায় হয়েছিল যথাক্রমে ৪৪ কোটি ২৫ লাখ এবং ২৫ কোটি ১৮ লাখ টাকা।

অন্যদিকে অর্থঋণ আদালতে ব্যাংকটির ২ হাজার ৫৯৬টি মামলা চলমান রয়েছে। গত জুন পর্যন্ত এসব মামলায় আটকে থাকা অর্থের পরিমাণ ১২ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা।

মূলধন ঘাটতি ও লোকসানে আর্থিক চাপ

জুনে ব্যাংকটির প্রকৃত মূলধন ঘাটতি ছিল ১৮ হাজার ২৬ কোটি টাকা। তবে রেগুলেটরি ফারবিয়ারেন্সের পর ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ২৩২ কোটি টাকা। একই সময়ে পরিচালন লোকসান হয়েছে ২৩৩ কোটি এবং নিট লোকসান হয়েছে ৩৯৭ কোটি টাকা।

জুন শেষে ব্যাংকটির আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭২ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা। বিপরীতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ৪৭ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা। এ সময় ব্যাংকটির ঋণ-আমানত অনুপাত দাঁড়ায় ৭০ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

ব্যাংক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি খেলাপি ঋণ তারল্য সংকট বাড়াচ্ছে। আমানতের অর্থ প্রভিশন সংরক্ষণে আটকে থাকায় নতুন ঋণ বিতরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর মূলধন সংকটও বাড়ছে, যা আর্থিক খাতের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।

শনিবার ঢাকার এক অনুষ্ঠানে জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখন মোট ঋণের ৩২ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এটি ঋণ আদায় ও পুনর্বিনিয়োগের স্বাভাবিক চক্রকে ব্যাহত করছে।

কৃষিঋণ বিতরণে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়াল ব্যাংকটি

আর্থিক সংকটের মধ্যেও কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে ঋণ বিতরণে অগ্রগতি রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যাংকটি ৪০০ কোটি টাকা কৃষিঋণ বিতরণ করেছে। পরের অর্থবছরে বিতরণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫০৫ কোটি টাকা। উভয় অর্থবছরেই নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করেছে ব্যাংকটি।

নজরদারি জোরদার করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ কমাতে নজরদারি বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মূলধন ঘাটতি ও উচ্চ খেলাপি ঋণে থাকা ব্যাংকগুলোর জন্য সিপিএ নীতিমালা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

এ ছাড়া ঋণ অবলোপন নীতিমালা আধুনিকায়ন করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অর্থঋণ আদালতের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্যও তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছ থেকে সরাসরি নগদ আদায়ে মাসিক ও ত্রৈমাসিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঋণ পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিলের সুযোগ সীমিত করা হয়েছে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/20826 ,   Print Date & Time: Sunday, 1 November 2026, 12:46:35 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh