![]()
ইবি রিপোর্ট
নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক করার পর প্রায় ১৯ বছর পেরিয়ে গেছে। দীর্ঘ আইনি লড়াই ও সুশীল সমাজের দাবির পর ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে পৃথক বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেসির কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। কিন্তু ঐতিহাসিক সেই পদক্ষেপের প্রায় দুই দশক পরও বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়নি বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা। বিশেষ করে অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত প্রশাসনিক ক্ষমতায় নির্বাহী বিভাগের প্রভাব এবং সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা মাসদার হোসেন মামলা। ১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর আপিল বিভাগ এ মামলায় ঐতিহাসিক রায় দেন। বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করতে সরকারকে ১২ দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল ওই রায়ে।
দীর্ঘসূত্রতার পর ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর পৃথক বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেসির কার্যক্রম শুরু হয়। বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটরা স্বতন্ত্রভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের কাছ থেকে বিচারিক ক্ষমতা প্রত্যাহার করা হয়। বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের জন্য পৃথক চাকরিবিধি ও নিয়োগ কাঠামোও প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মধ্য দিয়ে বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি ঘটে।
তবে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত ক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক এরপরও অব্যাহত থাকে। সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিধানের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত। সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি এ ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। আইনজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতার সঙ্গে নির্বাহী কাঠামোর সম্পর্ক থাকায় বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিষয়ে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ রয়ে গেছে। কোনো সরকারই এই দ্বৈত নিয়ন্ত্রণের কাঠামো থেকে বিচার বিভাগকে পুরোপুরি বের করে আনেনি।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বিচার বিভাগ স্বাধীন হোক, রাষ্ট্রের অন্য অঙ্গগুলো তা চায় না। এখনো কাগজে-কলমেই রয়ে গেছে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। বিচার বিভাগ যতক্ষণ পর্যন্ত স্বাধীন না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে দাঁড় করানো যাবে না।’
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশনের পৃথক সচিবালয় থাকলেও বিচার বিভাগের জন্য এমন ব্যবস্থা নেই। একটি সচিবালয় উদ্বোধন হওয়ার পরও তা টিকে থাকতে পারেনি। উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় হতাশা প্রকাশ করেন তিনি।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, তৈলাক্ত বাঁশে ওঠানামার মতো অবস্থা এখন বিচার বিভাগের স্বাধীনতার। বিরোধী দলে থাকলে রাজনৈতিক পক্ষগুলো বিচার বিভাগের স্বাধীনতা চায়, কিন্তু সরকারে গেলে সেই অবস্থান বদলে যায়। সব সরকারের আমলেই এমনটি ঘটেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, বিচার বিভাগের সচিবালয় যদি কোনো মন্ত্রীর অধীনে থাকে, তাহলে স্বাধীনতার মূল চেতনা প্রতিফলিত হবে না।
বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আলোচনায় পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়টি সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ গুরুত্ব পায়। ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ জারি হয়। ১১ ডিসেম্বর এর কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়।
এই সচিবালয় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল অধস্তন আদালতের বিচারকদের প্রশাসনিক কার্যক্রমে সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাতন্ত্র্য জোরদার করা।
তবে উদ্যোগটি বেশিদিন কার্যকর থাকেনি। চলতি বছরের ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে সচিবালয়-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ রহিত করা হয়। ২০ মে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করা হয়। সেখানে দায়িত্ব পালন করা ১৫ জন বিচারককে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। এর ফলে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
অন্যদিকে, গত ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের সংশ্লিষ্ট সংশোধনী অসাংবিধানিক ঘোষণা করে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন। চলতি বছর ৭ এপ্রিল প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়।
তবে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৯ জুন আপিল বিভাগ ওই রায়ের ওপর স্থগিতাদেশ দেন। ফলে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা নিয়ে আইনি জটিলতা এখনো কাটেনি।
বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের ১৯ বছর পূর্তির প্রেক্ষাপটে তাই বিচারকদের প্রশাসনিক স্বাধীনতা, নিয়োগ ও পদোন্নতির কাঠামো এবং পৃথক সচিবালয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা আবারও সামনে এসেছে।