![]()
ইবি রিপোর্ট
এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন থেকে যেন একটি বছর হারিয়ে না যায়, সে লক্ষ্যে দ্রুত পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার। সম্ভব হলে ফল প্রকাশের এক মাসের মধ্যেই এই পরীক্ষা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে উত্তরপত্র মূল্যায়নে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং পরীক্ষার্থীদের জন্য পূর্ণাঙ্গ পুনর্নিরীক্ষার সুযোগ চালু করা হয়েছে।
শনিবার সকালে সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এইচএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন। সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন ফলাফলের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
মাহ্দী আমিন বলেন, শিক্ষার্থীদের সময় ও মূল্যবান শিক্ষাজীবন রক্ষায় এবার একটি নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এক বা দুই বিষয়ে অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের জন্য দ্রুততম সময়ে, সম্ভব হলে এক মাসের মধ্যেই পুনরায় পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হবে। এতে দীর্ঘসূত্রতা ছাড়াই তাঁরা পরবর্তী উচ্চশিক্ষার ধারায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন।
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এবার পরীক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি উত্তরপত্র মূল্যায়নেও শতভাগ নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চিত করা হয়েছে। অতীতে জিপিএ-৫ ও পাসের হার কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেখানোর যে চর্চা ছিল, তা থেকে বেরিয়ে এসে মেধার যথাযথ মূল্যায়ন এবং সততার সঙ্গে খাতা দেখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এবার এসএসসি পরীক্ষার আদলে প্রথমবারের মতো এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্যও উত্তরপত্রের পূর্ণাঙ্গ পুনর্নিরীক্ষার সুযোগ রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় মোট ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ছাত্র ৬ লাখ ৭ হাজার ৬৪৯ জন এবং ছাত্রী ৬ লাখ ৩৩ হাজার ১৪৯ জন।
উত্তীর্ণ হয়েছেন মোট ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। তাঁদের মধ্যে ছাত্র ২ লাখ ৯০ হাজার ১৫৭ জন এবং ছাত্রী ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৫২৮ জন। ছাত্রদের পাসের হার ৪৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং ছাত্রীদের ৫৬ দশমিক ৩১ শতাংশ। জাতীয় পর্যায়ে মোট পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ।
এবার জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন শিক্ষার্থী। তাঁদের মধ্যে ২০ হাজার ৩৬৩ জন ছাত্র এবং ১৯ হাজার ৭২১ জন ছাত্রী।
মাহ্দী আমিন বলেন, বর্তমান নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরীক্ষা সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশে সম্পন্ন করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অসদুপায় ঠেকাতে শিক্ষামন্ত্রীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতা বাড়ানো হয়েছে এবং বডি ওর্ন ক্যামেরার ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে এবার উচ্চমাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষা আনন্দমুখর ও ইতিবাচক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ এবং জিপিএ-৫ অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে মাহ্দী আমিন তাঁদের সাফল্যকে জাতির গর্ব বলে উল্লেখ করেন। গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের উদ্দেশে তিনি এসব শিক্ষার্থীর মেধা, সংগ্রাম ও অনুপ্রেরণার গল্প তুলে ধরার আহ্বান জানান।
তবে তিনি বলেন, এইচএসসি বা সমমানের পরীক্ষার ফল কোনো শিক্ষার্থীর জীবনের সামগ্রিক সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার একমাত্র মাপকাঠি নয়। যাঁরা প্রত্যাশিত ফল পাননি, তাঁদের প্রতি সরকারের সমর্থন ও সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
অভিভাবক ও শিক্ষকদের প্রতি শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক মানসিক বিকাশ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানান উপদেষ্টা। শুধু ফলাফলের ভিত্তিতে তাঁদের মূল্যায়ন না করে জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে সাহস ও ইতিবাচক প্রেরণা দিয়ে পাশে থাকার অনুরোধ করেন তিনি।
সব শিক্ষার্থীকে চিকিৎসক কিংবা প্রকৌশলী হতে হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই বলে মন্তব্য করেন মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দর্শন অনুযায়ী প্রত্যেক শিক্ষার্থীর মেধা, মনন ও পছন্দ বিকাশের সমান সুযোগ তৈরি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
উচ্চমাধ্যমিক পাসের পর যাঁরা কর্মজীবনে প্রবেশ করতে চান, তাঁদের জন্য তিন মাস, ছয় মাস কিংবা এক বছর মেয়াদি আধুনিক কারিগরি শিক্ষা, ভোকেশনাল কোর্স ও তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ তৈরিতে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে আগ্রহীদের বিজ্ঞান, মানবিক কিংবা ব্যবসায় শিক্ষার পছন্দের বিষয়ে পড়ার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করার উদ্যোগও রয়েছে।
সরকারের শিক্ষা ভাবনার লক্ষ্য মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক সুনাগরিক গড়ে তোলা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব নাগরিক শুধু নিজেদের পরিবারের সচ্ছলতা আনবেন না, ভবিষ্যতে স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তেও নেতৃত্ব দেবেন।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী গিয়াস উদ্দিন রিমন, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব কেরামত আলী, সব শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।