![]()
ইবি রিপোর্ট
বিপুল খেলাপি ঋণ এবং বিনিয়োগ থেকে আয় কমে যাওয়ায় ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে বড় অঙ্কের লোকসান করেছে দেশের বেসরকারি খাতের দুই ব্যাংক—ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ও ন্যাশনাল ব্যাংক। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক দুটি সম্মিলিতভাবে ৬ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা লোকসান করেছে।
প্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে ইসলামী ব্যাংকের সমন্বিত লোকসান হয়েছে ৩ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা। অন্যদিকে ন্যাশনাল ব্যাংকের লোকসান দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা।
নয় মাসের আর্থিক ফলাফল অনুমোদনের জন্য গত বৃহস্পতিবার ব্যাংক দুটির পরিচালনা পর্ষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, গতকাল সংবাদপত্রে আর্থিক ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। তবে পূর্ণাঙ্গ প্রান্তিক আর্থিক প্রতিবেদন এখনো প্রকাশিত হয়নি।
ইসলামী ব্যাংকের বড় লোকসান
২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ সমন্বিতভাবে প্রায় ১০০ কোটি টাকা মুনাফা করেছিল। এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকটি ৩ হাজার ২৮৬ কোটি টাকার সমন্বিত লোকসানে পড়েছে। সহযোগী প্রতিষ্ঠানের আয় বাদ দিয়ে এককভাবে হিসাব করলে লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ হাজার ৩০২ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।
ব্যাংকটির প্রান্তিক আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে সবচেয়ে বেশি লোকসান হয়েছে। শুধু এই তিন মাসেই ব্যাংকটির লোকসান দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৭০ কোটি ১৮ লাখ টাকা।
লোকসানের কারণ হিসেবে ব্যাংকটি জানিয়েছে, বিনিয়োগ থেকে আয় কমে যাওয়া এবং আমানতের বিপরীতে মুনাফা পরিশোধের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অতীতে বড় অঙ্কের ঋণের বিপরীতে স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর তহবিল আত্মসাতের কারণে খেলাপি বিনিয়োগের পরিমাণ উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ফলে এসব বিনিয়োগ থেকে আয় হিসাবভুক্ত করার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।
ব্যাংকটি আরও জানিয়েছে, মেয়াদ শেষে মোট আমানতের পরিমাণ কমলেও আমানতের বিপরীতে প্রদত্ত মুনাফার ব্যয় বেড়েছে।
আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী মূলধন ভিত্তি শক্তিশালী করা, সম্পদের গুণগত মান উন্নয়ন, বিনিয়োগ আদায় বাড়ানো এবং আয় বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ইসলামী ব্যাংক।
২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সমাপ্ত নয় মাসে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক ৩৬ টাকা ৫৪ পয়সায় নেমেছে। ব্যাংকটির ভাষ্য, তৃতীয় প্রান্তিকে অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে আমানত তুলে নেওয়ার কারণে নগদ প্রবাহে এ অবনতি হয়েছে। আমানত সংগ্রহ জোরদার, পর্যাপ্ত তারল্য বজায় রাখা এবং পরিচালন নগদ প্রবাহ বাড়াতে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
২০২৫ সালে ইসলামী ব্যাংক ১৩৬ কোটি টাকা মুনাফা করলেও শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ দেয়নি।
ন্যাশনাল ব্যাংকের লোকসান বাড়ছে
ন্যাশনাল ব্যাংক ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে ৩ হাজার ১৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা লোকসান করেছে। আগের বছরের একই সময়ে ব্যাংকটির লোকসান ছিল ১ হাজার ৪৪৮ কোটি ৪২ লাখ টাকা। সে সময় শেয়ারপ্রতি লোকসান ছিল ৪ টাকা ৫০ পয়সা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে লোকসানের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংকটির লোকসান ছিল ২ হাজার ২৮৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। সে হিসাবে জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে নতুন করে ৭৩৩ কোটি ৪ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।
ব্যাংকটি জানিয়েছে, কিছু ঋণ ও অগ্রিম খেলাপি হয়ে পড়ায় এবং সেগুলো আদায় না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট সুদ আয় হিসেবে দেখানো যায়নি। একই সময়ে আমানত ও ধারের বিপরীতে সুদ ব্যয় বেড়েছে। এতে পরিচালন লোকসানের পাশাপাশি শেয়ারপ্রতি আয় ও নিট সম্পদমূল্যেও বড় পরিবর্তন এসেছে। তবে গ্রাহকদের আস্থা ফেরায় আগের বছরের তুলনায় আমানত তুলে নেওয়ার প্রবণতা কমেছে বলে জানিয়েছে ব্যাংকটি।
২০২২ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে বড় অঙ্কের লোকসান করছে ন্যাশনাল ব্যাংক। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চার বছর নয় মাসে ব্যাংকটির পুঞ্জীভূত লোকসান দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৯১৪ কোটি ১৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চার বছরে লোকসান হয়েছে ৮ হাজার ৮৯৭ কোটি ২৮ লাখ টাকা।
৭ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা
স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম ফিরিয়ে আনতে ন্যাশনাল ব্যাংক ৭ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক এই অর্থ দিয়েছে।
তবে সহায়তার অর্থ ব্যবহারে কয়েকটি শর্ত দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এসব অর্থ দিয়ে ন্যাশনাল ব্যাংকের সাবেক বা বর্তমান পরিচালকদের আমানত ফেরত দেওয়া যাবে না। একইভাবে নতুন ঋণ বিতরণেও এই তহবিল ব্যবহার করা যাবে না।
এর আগে গ্রাহকেরা টাকা জমা ও উত্তোলনের পাশাপাশি ঋণপত্র (এলসি) খোলা শুরু করায় অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে ন্যাশনাল ব্যাংক পূর্ণাঙ্গ ব্যাংকিং কার্যক্রমে ফিরেছে বলে এক প্রতিবেদনে জানানো হয়। বর্তমানে গ্রাহকেরা ব্যাংকটির সব শাখা ও এটিএম বুথ থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী টাকা তুলতে পারছেন। কিছু শাখায় ব্যবসায়িক হিসাবেও নতুন আমানত নেওয়া শুরু হয়েছে।