![]()
ইবি রিপোর্ট
এসএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্রে একাধিক বিষয়ে পাওয়া নম্বরের সঙ্গে প্রকাশিত ফলাফলের বড় ধরনের অমিল ধরা পড়েছে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে। তদন্তে দেখা গেছে, এক শিক্ষার্থীর ১১টি বিষয়ের নম্বর বাড়িয়ে ফল তৈরি করা হয়েছিল। পদার্থবিজ্ঞানে খাতায় শূন্য থাকলেও ফলাফলে দেখানো হয় ৪৫, আর উচ্চতর গণিতে শূন্যের জায়গায় বসানো হয় ৪৬। এ ঘটনায় বোর্ডের কম্পিউটার শাখার তিন কর্মী ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে বোর্ড কর্তৃপক্ষ।
চলতি বছরের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় ১০ বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার পরও এক শিক্ষার্থীকে ১১ বিষয়ে নম্বর বাড়িয়ে পাস করানোর অভিযোগ ওঠে। বোর্ডের গঠিত তদন্ত কমিটি অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছে বলে জানিয়েছে।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, এসএসসির ফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করার পর পদার্থবিজ্ঞানের উত্তরপত্রে শূন্য নম্বর থাকলেও কম্পিউটার সেলের প্রিন্ট আউটে ৪৫ নম্বর দেখতে পান দায়িত্বপ্রাপ্ত পরীক্ষক। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানোর পর অন্য বিষয়গুলোর নম্বরেও অসংগতি ধরা পড়ে।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, শিক্ষার্থীর বাংলার প্রথম পত্রে ২৩ নম্বরকে ৩৩ এবং দ্বিতীয় পত্রে ২৪-কে ৬২ করা হয়। ইংরেজির প্রথম পত্রে ৩৩-এর পরিবর্তে ৮৩ এবং দ্বিতীয় পত্রে ২০-এর জায়গায় ৮২ নম্বর বসানো হয়। গণিতে ৯-এর পরিবর্তে ৬৬, ইসলাম শিক্ষায় ৭-এর পরিবর্তে ৬৪ এবং উচ্চতর গণিতে শূন্যের বদলে ৪৬ নম্বর দেখানো হয়।
এ ছাড়া পদার্থবিজ্ঞানে শূন্যের পরিবর্তে ৪৫, রসায়নে ১-এর পরিবর্তে ৪৬, জীববিজ্ঞানে ১-এর পরিবর্তে ৪৬ এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়ে ৪-এর পরিবর্তে ৬৫ নম্বর যুক্ত করা হয়।
গত ৩০ অক্টোবর নগরের পাঁচলাইশ মডেল থানায় মামলাটি করেন চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সচিব প্রফেসর মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন। মামলায় আসামি করা হয়েছে কম্পিউটার সেলের স্ক্যানিং অপারেটর ইমতিয়াজ আহমেদ চৌধুরী (২৮), মো. রাশেদুল ইসলাম (৩০) এবং কম্পিউটার অপারেটর (সলভার) নূর হোসেন রায়হানকে (৩২)। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী হাসিবুল আলী শোভনকে (১৭) আসামি করা হয়েছে। তদন্তে শনাক্তযোগ্য অন্য ব্যক্তি ও অজ্ঞাতনামা সহযোগীদেরও এজাহারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৫, ৪৬৬, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ৪৭৭(ক) ধারা এবং পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন, ১৯৮০-এর ৫, ৬, ১২ ও ১৩ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
পাঁচলাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোজাম্মেল হক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের এসএসসি পরীক্ষার ফল জালিয়াতির অভিযোগে এক শিক্ষার্থীসহ বোর্ডের তিন কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। বোর্ডের সচিব মামলাটির বাদী। তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
গত ২৫ আগস্ট বোর্ড চেয়ারম্যানের নির্দেশে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। দুজন আইসিটি বিশেষজ্ঞের কারিগরি সহায়তায় কমিটি মূল উত্তরপত্র, পরীক্ষকদের হাতে লেখা নম্বর ফর্দ, প্রকাশিত ফলাফল, এমসিকিউ ওএমআর এবং কম্পিউটার সেলের তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে। ৯ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীর ইন্ধনে এবং কম্পিউটার সেলের তিন কর্মচারীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় পারস্পরিক যোগসাজশে নম্বর পরিবর্তন করা হয়। পরে সংশোধিত নম্বরের ভিত্তিতে ফলাফল তৈরি করে অনলাইনে প্রকাশ করা হয়।
অসংগতি ধরা পড়ার পর শিক্ষার্থীর ফল স্থগিত রাখা হয়। ১৫ অক্টোবর তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। ২৬ অক্টোবর জবাব দিলেও তা সন্তোষজনক না হওয়ায় মামলা করার সিদ্ধান্ত নেয় বোর্ড।
গত আগস্টে পুনর্নিরীক্ষণের সময় নম্বরের গরমিল ধরা পড়ার পর সংশ্লিষ্ট তথ্য কোন স্ক্যানিং মেশিনে প্রক্রিয়াকরণ করা হয়েছিল, তা যাচাই করে বোর্ড। মেশিন নম্বর, কর্মীদের দায়িত্ব পালনের সময় এবং সংশ্লিষ্ট দিনের কাজের তথ্য বিশ্লেষণ করে তিন অপারেটরকে সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করা হয়। এ কাজে কারিগরি যাচাইয়ের জন্য বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের সহায়তাও নেওয়া হয়। পরে তাঁদের দায়িত্ব থেকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
সে সময় টিবিএসকে দেওয়া বক্তব্যে অভিযুক্ত তিন কর্মী অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। তাঁদের দাবি ছিল, স্ক্যানিং, সর্টিং ও সলভিংয়ের কাজে কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষার্থীর উত্তরপত্র আলাদাভাবে শনাক্ত করে নম্বর পরিবর্তনের সুযোগ নেই। তবে তদন্ত প্রতিবেদনে তাঁদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়েছে।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে ফলাফল জালিয়াতির অভিযোগ নতুন নয়। ২০২৫ সালে আগের বছরের এসএসসি পরীক্ষার পুনর্নিরীক্ষণে ৩৪টি উত্তরপত্রে পাওয়া নম্বরের চেয়ে বেশি নম্বর ফলাফল শিটে অন্তর্ভুক্ত করার ঘটনা ধরা পড়ে। ওই ঘটনায়ও কম্পিউটার শাখার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল। তদন্ত কমিটির সুপারিশ মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর কথা জানানো হলেও কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা প্রকাশ করা হয়নি।
এর আগে ২০২৪ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ না নিয়েও ১৭ শিক্ষার্থীর জিপিএ-৫ পাওয়ার ঘটনা সামনে আসে। পরে বোর্ড তাঁদের ফল বাতিল করে।
এ ছাড়া ২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় বোর্ডের তৎকালীন সচিব নারায়ণ চন্দ্র নাথের ছেলের ১১টি পত্রের নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর ফল বাতিল করা হয়। পরে নারায়ণ চন্দ্র নাথ, তাঁর ছেলে নক্ষত্র দেবনাথ, সাবেক সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্ট কিবরিয়া মাসুদ খান এবং সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মুস্তফা কামরুল আখতারের বিরুদ্ধে মামলা হয়। তদন্ত শেষে চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।
বোর্ডে বারবার এ ধরনের অভিযোগ ওঠায় ফলাফল প্রস্তুত ও প্রকাশের প্রক্রিয়া, কম্পিউটার সেলের নিরাপত্তা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।