![]()
ইবি রিপোর্ট
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সময়কার বহুল আলোচিত একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে আলোচনায় এসেছিলেন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে ঘিরে নানা আলোচনা ও বিতর্কের পর বিমানবাহিনী থেকে তাঁর অবসরের বিষয়টিও সামনে আসে। এবার রাজধানীর উত্তরখানে তুরাগ নদ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছেন তিনি। তবে তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাত থেকে নিখোঁজ ছিলেন তাহসিফ। পরদিন বুধবার বিকেলে উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে নৌ-পুলিশ। উদ্ধারের পর তাঁর পরিচয়, কর্মজীবন, বিমানবাহিনী থেকে অবসর এবং ৫ আগস্টের ভিডিও ঘিরে আগের বিতর্ক নিয়ে আবারও আলোচনা শুরু হয়।
১৯৯৮ সালে জন্ম নেওয়া তাহসিফের বয়স হয়েছিল ২৮ বছর। তাঁর বাবার নাম কে এম এনায়েতুল করিম হেলাল। পরিবারের সঙ্গে রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে বসবাস করতেন তিনি।
তাহসিফের পরিচিতজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি ঢাকার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে পড়াশোনা করেন। পরে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির ৭৯তম বিএমএ দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের সমমানের জয়েন্ট সার্ভিস কোর্স সম্পন্ন করে বিমানবাহিনীতে যোগ দেন। সামরিক পাইলট হিসেবে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট পদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি।
তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্টের বায়োতে লেখা ছিল, ‘Veteran Military Pilot | Strategist | Entrepreneur’। মৃত্যুর তিন দিন আগে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে রাজধানীর ভাটারায় অতিরিক্ত ডিআইজির বাসায় মাদকবিরোধী অভিযান নিয়ে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন তিনি। একটি বেসরকারি টেলিভিশনের প্রতিবেদন শেয়ার করে সেখানে লিখেছিলেন, ‘Lol! Shame on DMP, Government needs to verify this case’। তাঁর ফেসবুক আইডিতে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার অনুসারী ছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেশত্যাগ করেন। ওই দিন গণভবন এলাকা থেকে তাঁর দেশত্যাগের ঘটনাপ্রবাহের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
ভিডিওটি ধারণ ও প্রকাশের সঙ্গে তাহসিফের নাম জড়িয়ে যায়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও তাঁকে ভিডিওটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে তাহসিফ নিজেই ভিডিওটি ধারণের বিষয়টি অস্বীকার করেন। তাঁর পরিচিতজনদের কারও কারও দাবি, এ ঘটনার পর থেকে তাঁকে নিয়ে নেতিবাচক প্রচার চালানো হয়েছিল।
তাহসিফের বিমানবাহিনী ছাড়ার বিষয়টিও তাঁকে ঘিরে আলোচনার অংশ হয়ে ওঠে। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট এক বিবৃতিতে জানায়, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরি ও ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রিফাত আশরাফীকে বিমানবাহিনীর প্রচলিত আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করে যথাযথ প্রক্রিয়ায় অবসর দেওয়া হয়েছিল।
বিবৃতিতে বলা হয়, তাঁদের অবসরের সঙ্গে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতার কোনো সম্পর্ক নেই। এর আগে একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ওই দুই কর্মকর্তাকে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর দাবি করা হয়েছিল। আইএসপিআর সেই দাবিকে বিভ্রান্তিকর বলে উল্লেখ করে।
মঙ্গলবার রাত থেকে নিখোঁজ থাকার পর বুধবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ খবর আসে, উত্তরখান থানার রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসছে। খবর পেয়ে টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করেন।
নৌ-পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধারের সময় তাহসিফের পরনে ছিল সাদা পায়জামা ও কালো জামা। তাঁর হাতে ঘড়ি এবং পকেটে একটি আইফোন ছিল। ওই ফোনের সূত্র ধরে পরে তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
বৃহস্পতিবার নৌ-পুলিশের ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, মরদেহের শরীরে বাইরে থেকে দৃশ্যমান কোনো আঘাত বা জখমের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে এ কারণে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি জানা যেতে পারে।
মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে নৌ-পুলিশ।