• হোম > অর্থনীতি | জাতীয় | বাংলাদেশ > সংকটে দেশের ক্যাবল শিল্প, দুই বছরে বাজার সংকুচিত ২৫ শতাংশ

সংকটে দেশের ক্যাবল শিল্প, দুই বছরে বাজার সংকুচিত ২৫ শতাংশ

  • বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৬:৪৩
  • ২৭

---

 

ইবি রিপোর্ট

১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগে গড়ে ওঠা দেশের ক্যাবল শিল্প এখন বড় ধরনের সংকটের মুখে। সরকারি অবকাঠামো খাতে ব্যয় কমে যাওয়া, আবাসন খাতের মন্দা এবং ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহারের চাপে মাত্র দুই বছরে বাজারের আকার প্রায় ২৫ শতাংশ কমেছে। ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় অনেক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান লোকসানের মুখে পড়েছে, বন্ধ হচ্ছে কারখানা এবং বকেয়া থাকছে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা।

খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, ২০২২ সালে দেশের ক্যাবল বাজারের আকার ১২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছিল। বর্তমানে তা কমে আনুমানিক ৮ থেকে ৯ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ফলে ১০০-র বেশি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে সীমিত ক্রয়াদেশের জন্য প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ব্যাংকঋণ পাওয়ার সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর টিকে থাকাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিআরবি ক্যাবল ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক (মার্কেটিং) মো. রফিকুল ইসলাম রনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) বলেন, ক্যাবল বাজারের ৩০ শতাংশের বেশি সরকারি প্রকল্পনির্ভর। গত দুই বছরে সরকারি খাতে কাজ কমেছে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ। একই সময়ে আবাসন খাতে ক্যাবলের চাহিদা কমেছে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ। তাঁর ভাষ্য, উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও বাজারে সে অনুপাতে পণ্যের দাম বাড়ানো সম্ভব হয়নি।

বিদ্যুতায়ন, শিল্পায়ন, আবাসন এবং সরকারি বিনিয়োগের ওপর ভর করে ২০০৮ সালে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার এই শিল্পের আকার ২০২২ সালে ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়েছিল। সাম্প্রতিক মন্দা সেই প্রবৃদ্ধির ধারায় বড় বাধা তৈরি করেছে।

ওয়ালটন ক্যাবলসের হেড অব বিজনেস রাজু আহমেদ জানান, ক্যাবল উৎপাদনে বড় অঙ্কের চলতি মূলধন প্রয়োজন। ক্রেতাদের কাছ থেকে অর্থ পাওয়ার আগেই উৎপাদনকারীদের তামা, অ্যালুমিনিয়াম, রেজিনসহ বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। বিক্রি কমে যাওয়া এবং ঋণের উচ্চ সুদে উৎপাদন অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁর হিসাবেও গত দুই বছরে বাজার সংকুচিত হয়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ।

একসময় দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ পূরণ করা এবং ২৪টি দেশে পণ্য রপ্তানি করা প্যারাডাইস ক্যাবলস বর্তমান সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোবারক হোসেন বলেন, খেলাপি ঋণ, ঋণপত্র (এলসি) খোলার জটিলতা এবং প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় কারখানার কার্যক্রম চালু রাখা সম্ভব হয়নি।

তিনি জানান, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। শ্রমিকদের ২৫ থেকে ৩০ মাসের বেতন বকেয়া পড়েছে। এ ছাড়া প্রায় ২০০ কোটি টাকার বকেয়া ঋণ আদায়ে এবি ব্যাংক কারখানাটি নিলামে তুলেছে।

বিবিএস ক্যাবলসের আর্থিক অবস্থারও অবনতি হয়েছে। প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালে কর-পরবর্তী ১৪৫ কোটি টাকা মুনাফা করা প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৮৬ কোটি টাকা নিট লোকসান করেছে। কোম্পানির কর্মকর্তারা অর্ডার কমে যাওয়া, বড় সরকারি টেন্ডার না পাওয়া, কাঁচামাল আমদানিতে জটিলতা এবং অর্থায়ন ব্যয় বৃদ্ধিকে এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী করেছেন। একজন কর্মকর্তা জানান, প্রতিষ্ঠানটির আয় প্রায় ৪৬ শতাংশ কমেছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ব্যাংকঋণের ১২ থেকে ১৬ শতাংশ সুদ, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং পর্যাপ্ত এলসি সুবিধার অভাব উৎপাদনকারীদের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। পারটেক্স ক্যাবলস, সিটিজেন ক্যাবলস, গোল্ডেন ক্যাবলস ও সান ক্যাবলসও আর্থিক চাপ ও উৎপাদন বিঘ্নের মুখে রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

বাজার ছোট হয়ে আসায় প্রতিযোগিতা বাড়ছে। তবে আর্থিক সক্ষমতা ও বিস্তৃত বিপণন নেটওয়ার্কের কারণে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। কোম্পানি ও খাতসংশ্লিষ্টদের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ৩০ শতাংশের বেশি বাজার হিস্যা নিয়ে শীর্ষে রয়েছে বিআরবি ক্যাবল ইন্ডাস্ট্রিজ। প্রতিষ্ঠানটিতে সরাসরি কর্মরত রয়েছেন ১০ হাজারের বেশি মানুষ।

আরএফএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আর এন পাল বলেন, বড় করপোরেট গ্রুপগুলোর ব্যবসা সম্প্রসারণের ফলে ছোট উৎপাদনকারীরা পণ্যের মান বজায় রাখা এবং কাঁচামাল আমদানির জন্য এলসি খোলার ক্ষেত্রে বাড়তি সমস্যায় পড়ছেন।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের অধীন রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের প্রতিষ্ঠান বিজলী ক্যাবলস বাজারে বড় প্রতিযোগী হয়ে উঠেছে। আর এন পালের হিসাব অনুযায়ী, পাওয়ার ক্যাবলের বাজারের প্রায় ৩০ শতাংশ এবং বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত ক্যাবলের বাজারের ২৫ শতাংশ তাদের দখলে রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটি হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে চারটি কারখানায় প্রায় ২২০ কোটি টাকা এবং মিডিয়াম-ভোল্টেজ ক্যাবল প্ল্যান্টে আরও ৬০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। এতে বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৪ হাজার টন বেড়েছে।

নিজেদের ইলেকট্রনিকস ও অ্যাপ্লায়েন্স ব্যবসার চাহিদা পূরণে ২০১৯ সালের শেষ দিকে ক্যাবল খাতে প্রবেশ করে ওয়ালটন। পরে গবেষণা ও মান নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতা গড়ে তোলার পাশাপাশি রপ্তানিও শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি।

অন্যদিকে বাসাবাড়ি, শিল্প ও যোগাযোগ খাতের জন্য ক্যাবল উৎপাদনে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ৩০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের ঘোষণা দেয় আকিজবশির গ্রুপ। এ উদ্যোগে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০০ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।

রাজু আহমেদের ধারণা, ক্যাবল শিল্পের ওপর চাপ আরও এক থেকে দুই বছর থাকতে পারে। তবে অবকাঠামো প্রকল্প আবার চালু হলে এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালনে ভূগর্ভস্থ ও মিডিয়াম-ভোল্টেজ ক্যাবলের ব্যবহার বাড়লে বাজার পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেছেন, বিদ্যমান কারখানাগুলোই সক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদন করছে। এ অবস্থায় নতুন বিনিয়োগ এলে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হয়ে মূল্য প্রতিযোগিতা আরও বাড়তে পারে।

বিশেষায়িত ও মিডিয়াম-ভোল্টেজ ক্যাবলের চাহিদা পূরণে বাংলাদেশ এখনও আমদানির ওপর নির্ভরশীল। আর এন পালের মতে, আগের হিসাব অনুযায়ী দেশের মোট চাহিদার ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ ক্যাবল আমদানি করা হয়। মিডিয়াম-ভোল্টেজ ক্যাবলের চাহিদার মাত্র ২০ শতাংশের মতো পূরণ করতে পারেন স্থানীয় উৎপাদনকারীরা।

খাতসংশ্লিষ্টদের প্রাক্কলন অনুসারে, শুল্ক শ্রেণিবিন্যাসভেদে হার আলাদা হলেও ক্যাবল তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে গড় শুল্ক প্রায় ৪০ শতাংশ। তৈরি ক্যাবল আমদানির ক্ষেত্রে তা প্রায় ৪৫ শতাংশ। তাঁদের দাবি, বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত সরকারি প্রকল্পে যোগ্য স্থানীয় উৎপাদনকারীদের প্রতিযোগিতার ন্যায্য সুযোগ দিতে হবে।

কম দামের নন-ব্র্যান্ডেড ক্যাবলও স্থানীয় শিল্পের জন্য উদ্বেগ তৈরি করছে। বাজারের বর্তমান যাচাইকৃত পরিসংখ্যান না থাকলেও আগের প্রাক্কলন অনুযায়ী, প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার ব্র্যান্ডেড ক্যাবলের বাজারের বিপরীতে নন-ব্র্যান্ডেড পণ্যের বাজার ১ হাজার কোটি টাকার বেশি।

বাংলাদেশ ইলেকট্রিক্যাল ক্যাবলস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আনিসুর রহমান বলেন, অননুমোদিত উৎপাদন ও আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা এখনও কঠিন। তাঁর মতে, ক্রেতারা অনেক সময় প্রয়োজনীয় কারিগরি মান যাচাই না করে শুধু কম দামের কারণে এসব পণ্য কিনছেন।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/20554 ,   Print Date & Time: Wednesday, 28 October 2026, 12:56:46 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh