![]()
ইবি রিপোর্ট
টানা দরপতনে দেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নিষ্ক্রিয়তা বাড়ছে। প্রধান মূল্যসূচক ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ডিএসইএক্স ৫৯৬৬ পয়েন্ট থেকে কমে গতকাল ৫৩৮৬ পয়েন্টে নেমেছে। তবে বাজারের এই নিম্নমুখী প্রবণতার মধ্যেও সায়হাম টেক্সটাইল, নিটল ইন্স্যুরেন্স, জিবিবি পাওয়ার, অলটেক্স ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সসহ কয়েকটি কোম্পানির শেয়ারদর ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
শুধু তাই নয়, মিউচুয়াল ফান্ড খাতের দুর্বল অবস্থার মধ্যেও প্রাইম ফাইন্যান্স প্রথম মিউচুয়াল ফান্ডের দর প্রায় ৭০ শতাংশ বেড়ে ৩৭ টাকা ছাড়িয়েছে। অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির এমন পরিস্থিতিতে কয়েকটি শেয়ারের লেনদেন বিশ্লেষণ করে কারসাজির নির্দিষ্ট আলামত পেয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
প্রাইম ফাইন্যান্স প্রথম মিউচুয়াল ফান্ডের দরবৃদ্ধির পেছনে কারসাজি হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে ইতোমধ্যে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে কমিশন। সর্বশেষ বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে চিঠি দিয়েছে বিএসইসি।
বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারদর পর্যালোচনায় দেখা গেছে, শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই দাম ১০৩ টাকা থেকে বেড়ে ১৭৭ টাকায় পৌঁছেছিল। অথচ এক বছর আগে কোম্পানিটির শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে মাত্র ৩৯ টাকায়। কয়েক দফায় মূল্যবৃদ্ধির পর গতকাল মঙ্গলবার ডিএসইতে শেয়ারটির সর্বশেষ দর ছিল ১৬২ টাকা।
বিএসইসি গত ১৫ জুন থেকে শেয়ারটির দর বৃদ্ধির পেছনের কারণ তদন্ত করতে বলেছে। এ ক্ষেত্রে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততায় ‘ইনসাইডার ট্রেডিং’ হয়েছে কি না, কোনো অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে কি না এবং মার্জিন ঋণের অপব্যবহার ঘটেছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া শেয়ারটির অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির সময় কোনো ব্রোকারেজ হাউস বা অনুমোদিত প্রতিনিধি স্টক ব্রোকার, স্টক ডিলার ও অনুমোদিত প্রতিনিধি বিধিমালার আচরণবিধি মেনে গ্রাহকদের পক্ষে লেনদেন করেছেন কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রাখতে বলেছে কমিশন।
বিএসইসির কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বাজারে দীর্ঘদিনের মন্দার কারণে শেয়ার কেনাবেচায় ছোটখাটো অনিয়ম বা আইনের লঙ্ঘন অনেক সময় শনাক্ত করা হচ্ছিল না। এই সুযোগে কিছু চক্র কারসাজির মাধ্যমে মুনাফা তুলে নিচ্ছে। এর ফলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতির মুখে পড়ছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। কিছু ব্রোকারেজ হাউস ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কারসাজিতে উৎসাহ দেওয়া এবং বেআইনি লেনদেনের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এ কারণে পুরো বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে ডিএসইকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার ডিএসইতে লেনদেন হওয়া প্রায় ৫৭ শতাংশ শেয়ারের দর কমেছে। বিপরীতে বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ শেয়ারের দাম। দিন শেষে ডিএসইএক্স প্রায় ১৩ পয়েন্ট হারিয়ে ৫৩৮৬ পয়েন্টে দাঁড়ায়। সর্বশেষ ছয় কর্মদিবসের মধ্যে পাঁচ দিনই সূচকের পতন হয়েছে। যদিও গত সোমবার সূচক প্রায় ২৮ পয়েন্ট বেড়েছিল, পুরো সময়ে সূচক কমেছে মোট ৬৫ পয়েন্ট।
দিন শেষে ১০৪টি কোম্পানির শেয়ারদর বেড়েছে, কমেছে ২০০টির এবং ৪৪টির দর অপরিবর্তিত ছিল। পুরো লেনদেনের সময় মাত্র ১৭টি কোম্পানির শেয়ারদর বেড়ে কেনাবেচা হয়েছে। অন্যদিকে, ৩১৬টি কোম্পানির শেয়ার লেনদেনের কোনো না কোনো পর্যায়ে দর হারিয়েছে।
গতকাল ডিএসইতে মোট ৪০৩ কোটি টাকার শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন লেনদেনের দিক থেকে সপ্তম। ব্রোকারেজ হাউস কর্মকর্তারা জানান, মে ও জুন মাসে বাজার ঊর্ধ্বমুখী থাকায় বিনিয়োগকারীরা নতুন করে সক্রিয় হয়েছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক দরপতনে তাদের অধিকাংশই আবার নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন।
বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউসের কর্মকর্তারা জানান, জুনে হিসাব বছর শেষ হওয়া কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ ঘোষণায় মুনাফা কমার চিত্র দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে সামগ্রিক অর্থনীতিতে ধীরগতি রয়েছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও এডিবি বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নিয়ে আগের পূর্বাভাস কমিয়েছে। এসব পরিস্থিতি বিনিয়োগকারীদের কাছে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে, যার প্রভাব শেয়ারবাজারেও পড়ছে।