• হোম > অর্থনীতি | জাতীয় | বাংলাদেশ > রপ্তানি প্রণোদনা পেতে দেড় বছর, দ্রুত অর্থ ছাড়ের দাবি ব্যবসায়ীদের

রপ্তানি প্রণোদনা পেতে দেড় বছর, দ্রুত অর্থ ছাড়ের দাবি ব্যবসায়ীদের

  • বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৪
  • ২৩

---

 

ইবি রিপোর্ট

রপ্তানি খাতকে সহায়তা দিতে সরকারের দেওয়া নগদ প্রণোদনার অর্থ সময়মতো না পাওয়ায় আর্থিক চাপে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। পণ্য ও সেবা রপ্তানির বিপরীতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে সরকারের বকেয়া দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি নথি অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসের প্রণোদনার অর্থ এখনো পরিশোধ করা হয়নি।

সরকার জুন পর্যন্ত রপ্তানি প্রণোদনার অর্থ পরিশোধ করলেও পরবর্তী তিন মাসের পাওনা বাকি রয়েছে। এই অর্থের ওপর নির্ভরশীল রপ্তানিকারকদের ব্যবসা পরিচালনা, বাজেট তৈরি এবং নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের মতে, সময়মতো প্রণোদনা না পাওয়ায় এ সহায়তার মূল উদ্দেশ্যও ব্যাহত হচ্ছে।

রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো নিজস্ব তহবিল থেকে প্রেরকদের ২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রণোদনা দিয়ে থাকে। তবে রপ্তানির ক্ষেত্রে ব্যবস্থা আলাদা। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে সরকার প্রণোদনার অর্থ ছাড় করার পর তা রপ্তানিকারকদের হাতে পৌঁছায়। ফলে সরকারি অর্থ ছাড়ে বিলম্ব হলে ব্যবসায়ীরাও নির্ধারিত সময়ে সহায়তা পান না।

রপ্তানিকারকদের অভিযোগ, ভারত ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোতে ব্যবসায়ীরা তুলনামূলক বেশি প্রণোদনা পান এবং দ্রুত অর্থ হাতে পান। এতে ওই দেশগুলোর উদ্যোক্তারা ব্যবসা সম্প্রসারণ ও নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সুবিধা পাচ্ছেন।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) পরিচালক ও সাউদার্ন নিটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমরান কাদের তূর্য বলেন, প্রতিযোগী দেশগুলো তাদের রপ্তানিকারকদের বেশি সুবিধা দেয়।

তিনি বলেন, ‘ভারত, ভিয়েতনামের রপ্তানিকারকরা সময়মতো প্রণোদনার অর্থ পেয়ে যায়। তাতে ব্যবসা বড় করা কিংবা নতুন বিনিয়োগ করায় এক ধরনের সুযোগ পান তারা।’

তূর্যের ভাষ্য, বাংলাদেশে সরকারি সহায়তার অর্থ কখন পাওয়া যাবে, তা নিয়ে রপ্তানিকারকদের অনিশ্চয়তায় থাকতে হয়। এর ফলে বাজেট প্রণয়ন, বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা পিছিয়ে যায়। তাঁর মতে, সারা বছর নিয়মিত প্রণোদনা না দিয়ে সাধারণত দুই ঈদের আশপাশে অর্থ ছাড় করা হয়।

তিনি বলেন, ‘তবে এটা তো হওয়া উচিত নয়, মাসের প্রণোদনার অর্থ মাসেই সরকার থেকে ছাড় দেওয়া উচিত। অন্তত মাসে ৬০ শতাংশ প্রণোদনা ছাড় করলেও, প্রণোদনার অর্থের উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয়।’

বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, পণ্য জাহাজীকরণের পর রপ্তানিকারকদের প্রণোদনার অর্থ পেতে সাধারণত প্রায় ১৮ মাস অপেক্ষা করতে হয়।

রপ্তানি আয় দেশে আসার পর ব্যবসায়ীরা প্রণোদনার জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকে আবেদন করেন। ব্যাংক আবেদনটি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠায়। যাচাই-বাছাই শেষে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান সনদ দিলে তা আবার বাণিজ্যিক ব্যাংকে আসে। এরপর প্রয়োজনীয় নথিপত্র বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হয়।

হাতেমের তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নথি পাঠানোর আগের ধাপগুলোসহ পুরো প্রক্রিয়ায় প্রায় এক বছর লেগে যেতে পারে। অন্যদিকে, পণ্য জাহাজীকরণের পর রপ্তানি আয় দেশে আসতে প্রায় ছয় মাস সময় লাগে। সব মিলিয়ে প্রণোদনার অর্থ হাতে পেতে প্রায় দেড় বছর পার হয়ে যায়।

তিনি জানান, আগে এই অপেক্ষার সময় দুই বছর পর্যন্ত দীর্ঘ হতো। বর্তমানে কিছুটা কমলেও দীর্ঘসূত্রতার কারণে ব্যবসায়িক পরিকল্পনায় সমস্যা থেকেই যাচ্ছে। একসময় বকেয়া প্রণোদনার পরিমাণ ছিল ৫ হাজার কোটি টাকা। সরকারের প্রণোদনার হার কমানোর কারণে বকেয়ার পরিমাণও আগের তুলনায় কমেছে বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সিটি ব্যাংকের কাছে সরকারের বকেয়া ১১২ কোটি টাকা, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ৩২ দশমিক ৪৫ কোটি টাকা, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ৯৮ কোটি টাকা, ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের ৩৩ দশমিক ৮৬ কোটি টাকা এবং ইস্টার্ন ব্যাংকের ১০০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ নীতিমালা অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও দেশের ৪৩টি রপ্তানি খাতের উদ্যোক্তারা নগদ প্রণোদনা বা সহায়তা পাওয়ার যোগ্য। খাতভেদে এ সহায়তার হার শূন্য দশমিক ৩০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ। তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাত এই সহায়তার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী। তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ৫ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হয়।

২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দুই দফায় রপ্তানি প্রণোদনা কমিয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় উন্নীত হবে।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বিধিবিধান অনুযায়ী, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর রপ্তানি প্রণোদনা বা নগদ সহায়তা দেওয়ার সুযোগ থাকবে না। একবারে সহায়তা প্রত্যাহার করা হলে রপ্তানি খাত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে—এ বিবেচনায় ধাপে ধাপে প্রণোদনা কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

তবে বর্তমানে বকেয়া অর্থ ছাড়ে বিলম্ব এবং প্রণোদনা পাওয়ার দীর্ঘ প্রক্রিয়া নিয়ে রপ্তানিকারকদের উদ্বেগ রয়েছে। তাঁদের মতে, নির্ধারিত সময়ে সহায়তা পাওয়া গেলে ব্যবসা পরিচালনা, বিনিয়োগ ও রপ্তানি সক্ষমতা ধরে রাখার পরিকল্পনা করা সহজ হবে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/20504 ,   Print Date & Time: Wednesday, 28 October 2026, 10:01:09 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh