![]()
ইবি রিপোর্ট
চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন হার ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটের মাত্র ৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ অর্থ ব্যয় করতে পেরেছে। উন্নয়ন প্রকল্পের এই ধীরগতি সরকারি বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদেরা।
সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ অবকাঠামো, স্কুল ও হাসপাতাল নির্মাণের মতো প্রকল্পে সরকারি ব্যয় বাড়লে নির্মাণসামগ্রী, পরিবহন, শ্রম ও বিভিন্ন সেবার চাহিদা তৈরি হয়। এর প্রভাব পড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে। একই সঙ্গে এসব কর্মকাণ্ড থেকে সরকারের রাজস্ব আদায়ের সুযোগও বাড়ে। ফলে উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন দীর্ঘায়িত হলে অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে যেতে পারে।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৫ দশমিক ০৯ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে এ হার ছিল ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছিল।
চলতি অর্থবছরে সংস্থাগুলোর নিজস্ব তহবিলসহ এডিপির মোট আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রথম তিন মাসে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১২ হাজার ১৮ কোটি টাকা।
আগে অনুমোদিত প্রকল্পগুলো বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকার ও লক্ষ্য অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন কি না, তা পর্যালোচনার কারণে এ বছর উন্নয়ন ব্যয়ের গতি কমেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাঁদের ভাষ্য, অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে পরিকল্পনা তৈরি, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা ও প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তুতিতে সময় লাগে। তবে অর্থবছরের সময় গড়ানোর সঙ্গে সাধারণত ব্যয়ের গতি বাড়ে।
উন্নয়ন ব্যয়ের ধীরগতিতে প্রবৃদ্ধি ও সরকারি সেবায় প্রভাব
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা বলেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো খাতে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ধীর হলে মানবসম্পদ উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড সচল রাখতেও সরকারি বিনিয়োগের ভূমিকা রয়েছে।
তাঁর মতে, আইএমইডির নিয়মিত তদারকির পাশাপাশি সরকারি ব্যয়ের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন আরও জোরদার করা প্রয়োজন। কোনো প্রকল্পে তিন মাস পরও প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হলে দ্রুত কারণ শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
বিদিশা আরও বলেন, উন্নয়ন ব্যয় কমে গেলে প্রকল্পের কেনাকাটা ও সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কমতে পারে। এতে এসব লেনদেন থেকে পাওয়া রাজস্বও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে টেকসই রাজস্ব প্রবৃদ্ধির প্রধান উৎস হিসেবে বেসরকারি খাতের ভূমিকার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
প্রকল্প পর্যালোচনায় সময় লাগছে
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক এনামুল হক বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগে, বিশেষ করে মার্চের আগে অনুমোদিত প্রকল্পগুলো বর্তমান সরকারের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় সময় লাগায় এডিপি বাস্তবায়ন ধীর হয়েছে বলে তাঁর ধারণা।
তিনি বলেন, প্রকল্প পর্যালোচনার প্রয়োজন থাকলেও বাস্তবায়নে আরও বিলম্ব এড়াতে দ্রুত এ কাজ শেষ করা উচিত। গত অর্থবছর শেষে সরকার সংশোধিত উন্নয়ন বাজেটের ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পেরেছিল।
এনামুল হকের মতে, অর্থনীতিতে টাকার প্রবাহ সচল রাখতে সরকারি বিনিয়োগের ভূমিকা রয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি না বাড়লে অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত গতি ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।
বৈদেশিক অর্থায়নের প্রকল্পে ব্যয় কমেছে
চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সরকারি তহবিল থেকে বরাদ্দ করা ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ব্যয় হয়েছে ৮ হাজার ৫৮ কোটি টাকা, যা বরাদ্দের ৪ দশমিক ২৮ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ খাতে ব্যয় হয়েছিল ৬ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা বা বরাদ্দের ৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ।
অন্যদিকে, বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে বরাদ্দ করা ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা বা ৩ দশমিক ১৩ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ খাতে ব্যয় ছিল ৫ হাজার ৭৪ কোটি টাকা বা বরাদ্দের ৫ দশমিক ৯০ শতাংশ।
সংস্থাগুলোর নিজস্ব তহবিল থেকে ৮ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৫১৮ কোটি টাকা।
বড় মন্ত্রণালয়গুলোর বাস্তবায়নেও ধীরগতি
এডিপিতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া ১৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সম্মিলিত বরাদ্দ মোট উন্নয়ন বাজেটের ৫২ দশমিক ৫০ শতাংশ। তবে সেপ্টেম্বর শেষে এসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ তাদের বরাদ্দের মাত্র ৬ দশমিক ৬২ শতাংশ ব্যয় করতে পেরেছে।
সবচেয়ে বেশি ৩৩ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া স্থানীয় সরকার বিভাগ ব্যয় করেছে ৪ হাজার ১১১ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ২৯ হাজার ৮৪১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় করেছে ১ হাজার ২২০ কোটি টাকা, যা বরাদ্দের প্রায় ৪ শতাংশ। বিদ্যুৎ বিভাগ ১৮ হাজার ১০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় করেছে ১ হাজার ২৬০ কোটি ৯৭ লাখ টাকা বা ৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ।
শিক্ষা খাতে ব্যয়ের হার তুলনামূলক বেশি ছিল। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় বরাদ্দের প্রায় ১৭ শতাংশ এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ ১৩ শতাংশ অর্থ ব্যয় করেছে।
অন্যদিকে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ বরাদ্দের ১ দশমিক ৭৮ শতাংশ, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ ১ দশমিক ৮৬ শতাংশ, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ২ দশমিক ০৫ শতাংশ এবং রেলপথ মন্ত্রণালয় ২ দশমিক ০৬ শতাংশ অর্থ ব্যয় করেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ব্যয়ের হার ছিল ২ দশমিক ২৭ শতাংশ।
প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়াতে সরকার মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রকল্প পর্যালোচনা দ্রুত শেষ করা, বাস্তবায়নের বাধা শনাক্ত করা এবং তদারকি জোরদার করা না গেলে উন্নয়ন ব্যয়ের ধীরগতি কাটানো কঠিন হবে।