![]()
ইবি আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন জোটের কাছে সার্বিয়ার আগাম সংসদ নির্বাচনে পরাজয় স্বীকার করেছেন দেশটির দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী নেতা আলেকসান্দার ভুচিস। চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগেই প্রাথমিক ভোটের হিসাব বিশ্লেষণ করে তিনি জানিয়েছেন, ২৫০ আসনের পার্লামেন্টে বিরোধী ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে। এই ফল দেশটির রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে বলে মনে করছেন আন্দোলনকারীরা।
রোববার ভুচিস জানান, সংগৃহীত ভোটের নমুনা বিশ্লেষণে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন জোটের ১৩৫ থেকে ১৪০টি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে, তাঁর দল সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির (এসএনএস) নির্বাচনি জোট পেতে পারে ১০৫টি আসন। চূড়ান্ত ফলাফল এখনো প্রকাশিত হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এটি স্পষ্ট যে আমরা এই নির্বাচনে হেরে গেছি।’
বেলগ্রেডভিত্তিক বার্তা সংস্থা ফোনেটের তথ্য অনুযায়ী, ভুচিসের এই ঘোষণার পর স্টুডেন্ট লিস্টের প্রধান কার্যালয়ে আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে। সমর্থকেরা নেচে-গেয়ে বিজয় উদ্যাপন করেন।
নির্বাচনি কার্যালয়ে দেওয়া বক্তব্যে জোটটির সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী রাদোমির সাইসিচ বলেন, প্রাথমিক ফলাফলে প্রায় সব ভোটকেন্দ্রেই শিক্ষার্থীদের সুস্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে থাকার চিত্র দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা জিতেছে। তাদের বিজয়ের সঙ্গে সেই আশাও জেগে উঠেছে যে সার্বিয়া ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা ও মর্যাদার দেশ হতে পারে। এই রাতটি যেন একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।’
২০১২ সাল থেকে সার্বিয়ার রাজনীতিতে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকা ভুচিস ও তাঁর দলের ক্ষমতা ধরে রাখার সক্ষমতা নির্ধারণে এই নির্বাচনকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছিল। দেশজুড়ে দুর্নীতিবিরোধী বিক্ষোভ থেকে জন্ম নেওয়া শিক্ষার্থী আন্দোলনের মুখে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে রোববার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টায় ভোটগ্রহণ শেষ হয়।
দেশটির রাজ্য নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ভোট পড়ার হার ছিল ৬৪.৯ শতাংশ। ১৯৯২ সালে যুগোস্লাভিয়া ভেঙে যাওয়ার পর এটিই সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি বলে জানানো হয়েছে।
শুক্রবার প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে বেলগ্রেড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জেলেনা ভাসিলজেভিচ আল জাজিরাকে বলেন, এসএনএসের নিজস্ব একটি নির্ভরযোগ্য ভোটারভিত্তি ছিল। অন্যদিকে, শিক্ষার্থীদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সাধারণত ভোট দিতে যান না—এমন মানুষদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসা।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো এবং ভোটগ্রহণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্বাধীন নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা সেন্টার ফর রিসার্চ, ট্রান্সপারেন্সি অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি (সিআরটিএ) জানিয়েছে, তাদের পর্যবেক্ষণ করা ৫০০টি ভোটকেন্দ্রের প্রায় এক-তৃতীয়াংশে ভোটার বা নির্বাচনি কর্মকর্তাদের ওপর চাপ প্রয়োগের ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে। ব্যালটের গোপনীয়তা রক্ষায় ব্যর্থতার ঘটনাও শনাক্ত করেছে সংস্থাটি।
আরেক পর্যবেক্ষক সংস্থা সেন্টার ফর ফ্রি ইলেকশনস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি (সিইএসআইডি) জানিয়েছে, বিকেল ৫টা পর্যন্ত তারা সম্ভাব্য অনিয়মের প্রায় ২৬০টি অভিযোগ পেয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে ব্যালটের ছবি তোলা, দলবদ্ধভাবে ভোট দেওয়া এবং ভোটারদের পরিচয় যাচাইয়ে জটিলতা।
ভুচিসের পরাজয় স্বীকারের ঘোষণার পর সার্বিয়ার বিভিন্ন স্থানে সমর্থকদের উল্লাস শুরু হয়। বেলগ্রেডের প্রধান সড়কগুলোতে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হন। স্টুডেন্ট লিস্টের সমর্থকেরা গাড়িতে চড়ে হর্ন বাজিয়ে আনন্দ প্রকাশ করেন। আতশবাজিতে আলোকিত হয়ে ওঠে আকাশ। অনেকে ‘আলেকসান্দার বিদায় নিয়েছে’ বলে স্লোগান দেন এবং শিক্ষার্থী আন্দোলনের গান গেয়ে উল্লাস করেন।
মধ্য বেলগ্রেডের একটি পার্কে ভুচিসের সমর্থকেরা এক বছরের বেশি সময় ধরে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান করছিলেন। জনতা সেগুলো ভেঙে দেয়।
ভোটার জানা ভাসিক আল জাজিরাকে বলেন, ‘এর অর্থ হলো ১২ বছর ধরে চলা একনায়কতন্ত্র থেকে মুক্তি পাওয়া, যার আগের সময়টার কথা আমার মনেও নেই। আমাদের প্রার্থীরা প্রথমে কী করবেন, সে বিষয়ে আমি পুরোপুরি নিশ্চিত নই। তবে আমার মনে হয়, আজ রাতে আমরা উদ্যাপন করব। আগামীকাল থেকে আসল কঠিন কাজ শুরু হবে।’
বেলগ্রেডের বাসিন্দা দ্রাগানা কোভেচেভিচ অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) বলেন, ‘সবাই মুখে হাসি নিয়ে একে অপরকে অভিবাদন জানাচ্ছে’—এ দৃশ্য তাঁকে রোমাঞ্চিত করেছে। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সবাই অনেক বেশি খুশি। অবশেষে আমরা একটি স্বাভাবিক ও মুক্ত দেশে পরিণত হতে যাচ্ছি।’
নির্বাচন চলাকালে রাজধানী বেলগ্রেডে রাজ্য নির্বাচন কমিশনের সদর দপ্তরের কাছে সড়ক বন্ধ করে ব্যারিকেড দেওয়া হয়। সেখানে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হেলমেট ও ঢালসহ পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সহিংসতা এড়িয়ে চলার আহ্বান জানান নগর প্রসিকিউটররা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে স্টুডেন্ট লিস্টকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন। তিনি জানান, আইনের শাসন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, দুর্নীতিবিরোধী লড়াই এবং শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সংস্কারে সহায়তা দিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রস্তুত। একই সঙ্গে ইইউতে সার্বিয়ার ভবিষ্যৎ এগিয়ে নিতে একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি।
২০২৪ সালের নভেম্বরে সার্বিয়ার নোভি সাদ শহরের একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ শুরু হয়। দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের জবাবদিহির দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন পরে সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও নিপীড়নের অভিযোগ ঘিরে বৃহত্তর প্রতিবাদে রূপ নেয়। তবে ভুচিস ও তাঁর দল এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
এই আন্দোলন থেকেই ‘স্টুডেন্ট লিস্ট—স্টুডেন্টস উইন’ নির্বাচনি উদ্যোগের জন্ম। চিকিৎসক ও শিক্ষাবিদসহ বিভিন্ন পেশার মানুষকে এ উদ্যোগে প্রার্থী করা হয়। তাঁদের অনেকেরই আগে রাজনীতিতে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা ছিল না। দুর্নীতির অবসান এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচার চালায় জোটটি। মূলধারার কয়েকটি বিরোধী দলও নিজস্ব প্রার্থী না দিয়ে শিক্ষার্থীদের উদ্যোগকে সমর্থন জানায়।
গত সেপ্টেম্বরে প্রেসিডেন্টের পদ থেকে পদত্যাগ করেন ভুচিস। উচ্চ পেনশন, সরকারি কর্মীদের বেতন বৃদ্ধি এবং নতুন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। তাঁর সমর্থকেরা সার্বিয়ার অর্থনীতি আধুনিকায়নে তাঁর নেতৃত্বের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন।
এবারের নির্বাচনে ২৫০টি সংসদীয় আসনের বিপরীতে প্রায় ৬৫ লাখ ভোটার ভোট দেওয়ার যোগ্য ছিলেন। প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ১৮টি নির্বাচনি তালিকা। সার্বিয়ার পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ১২৬টি আসন। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন জোট সেই সংখ্যার চেয়ে বেশি আসন পেতে পারে। তবে চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পরই নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক চিত্র নিশ্চিত হবে।