![]()
ইবি আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দীর্ঘ ১০ মাসেরও বেশি সময় নির্বাসনে থাকার পর নিজ দেশ ভেনেজুয়েলায় ফিরেছেন বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো। রোববার তাঁর প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে সমর্থকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা যায়। তবে দেশে ফিরে তিনি এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন, যেখানে ক্ষমতার পরিবর্তন, যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচন নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে নিজের ফেরার খবর জানিয়ে মাচাদো লেখেন, “আমি এখানে। আপনাদের সঙ্গে আছি।” এর আগে একাধিকবার দেশে ফেরার চেষ্টা করলেও প্রতিবারই বাধার মুখে পড়েছিলেন তিনি।
রোববার ভেনেজুয়েলার লারা রাজ্যের একটি গির্জায় প্রার্থনায় অংশ নেন মাচাদো। সেখানে উপস্থিত সমর্থকেরা তাঁকে ঘিরে ধরেন, জড়িয়ে ধরেন এবং হাত ধরে শুভেচ্ছা জানান। পরে সমর্থকদের একটি বহর নিয়ে রাজধানী কারাকাসের উদ্দেশে রওনা হন তিনি। পথে বিভিন্ন স্থানে সমর্থকেরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে তাঁকে স্বাগত জানান। গভীর রাতে কারাকাসে প্রবেশের সময় একটি গাড়ির ছাদের খোলা অংশ দিয়ে শরীরের ওপরের অংশ বের করে হাসিমুখে সমর্থকদের অভিবাদন জানান মাচাদো।
মাচাদোর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী এদমুন্দো গনসালেসও তাঁর দেশে ফেরার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “আমি আনন্দের সঙ্গে আপনাদের জানাচ্ছি, আমাদের নেত্রী, আমার প্রিয় মারিয়া কোরিনা, এখন ভেনেজুয়েলার মাটিতে রয়েছেন।”
গনসালেস আরও বলেন, “আজ ভেনেজুয়েলাবাসীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। তার সঙ্গে আমাদের সার্বভৌম কণ্ঠস্বর ফিরে এসেছে। তিনি এই প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দেবেন এবং আমাদের পথ দেখাবেন।” দেশের স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে কাজ এগিয়ে নিতে শিগগিরই তিনি মাচাদোর সঙ্গে ভেনেজুয়েলায় যোগ দেবেন বলেও জানান।
গত সেপ্টেম্বরে মাচাদোর এক উপদেষ্টা জানিয়েছিলেন, এর আগের কয়েক সপ্তাহে তিনি সাতবার দেশে ফেরার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু প্রতিবারই তাঁকে বাধা দেওয়া হয়। তাঁর প্রত্যাবর্তন বিলম্বিত করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও ওয়াশিংটন সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ভেনেজুয়েলা ছাড়ার আগে কয়েক দিন বিভিন্ন নিরাপদ আশ্রয়ে আত্মগোপনে ছিলেন মাচাদো। পরে নোবেল শান্তি পুরস্কার গ্রহণের জন্য নরওয়েতে যেতে অন্ধকারের আড়ালে একটি দ্রুতগতির নৌযানে করে দেশ ছাড়েন তিনি। তাঁর দেশে ফেরার বিষয়টি ট্রাম্প প্রশাসনের অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গণতন্ত্রের সমর্থক হিসেবে পরিচিত মাচাদো ২০২৩ সালে একটি স্বতন্ত্র প্রাথমিক নির্বাচনে জয়ী হন। মাদুরো সরকারের নির্বাচন কর্তৃপক্ষের বাইরে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে তিনি ৯০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছিলেন। তবে জয়ের পরও নিকোলাস মাদুরোর সরকার তাঁকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অনুমতি দেয়নি। তাঁর বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও করসংক্রান্ত আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়। মাচাদো অভিযোগগুলো অস্বীকার করে সেগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন।
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মাচাদোর ঘনিষ্ঠ সহযোগী গনসালেস বিরোধী প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। সরকারঘনিষ্ঠ নির্বাচন কর্তৃপক্ষ মাদুরোকে বিজয়ী ঘোষণা করলেও ভোটের বিস্তারিত হিসাব প্রকাশ করা হয়নি। বিরোধীরা দাবি করেন, নির্বাচনে মাদুরো নয়, গনসালেস জয়ী হয়েছেন। নিজেদের দাবির পক্ষে তাঁরা ভোটের ফলসংবলিত নথির অনুলিপি প্রকাশ করেন।
গত জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী মাদুরোকে ভেনেজুয়েলা থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়। বর্তমানে তিনি নিউইয়র্কের কারাগারে রয়েছেন এবং মাদক, অস্ত্র ও নির্যাতনসংক্রান্ত অভিযোগে তাঁর বিচার চলছে। তবে নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন মাদুরো। তাঁর ডেপুটি ডেলসি রদ্রিগেজকে সমর্থন দেয় ট্রাম্প প্রশাসন। পরে তিনি অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি তেল চুক্তি স্বাক্ষর করেন, যাতে যুক্তরাষ্ট্রকে অনুকূল শর্তে সুবিধা দেওয়া হয়।
মাচাদোর একজন মুখপাত্র তাঁর প্রত্যাবর্তনকে ‘গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে একটি বড় পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, এই প্রত্যাবর্তন অদূর ভবিষ্যতে অবাধ, সুষ্ঠু ও যাচাইযোগ্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজনের পথ সুগম করতে পারে। মুখপাত্র ডেভিড স্মোলানস্কি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, যুক্তরাষ্ট্র সরকার, কংগ্রেস ও মিত্র দেশগুলোর সরকারকে অব্যাহত নেতৃত্ব ও সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানান।
রোববার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, “তার ফিরে আসার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।” তবে মাচাদো নিরাপদে আছেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। ট্রাম্প আরও বলেন, “আমার মনে হয়, তিনি খুব ভালো একজন নারী। তিনি আমাকে তার নোবেল পুরস্কার দিয়েছেন। তাই তাকে নিয়ে আমি আর কী বলতে পারি? আমি আশা করি, তিনি নিরাপদে আছেন।”
গত জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে গিয়ে ট্রাম্পকে নিজের নোবেল পুরস্কার উপহার দিয়েছিলেন মাচাদো। তবে নোবেল পুরস্কার প্রদানকারী কমিটি জানিয়েছিল, “এই পুরস্কার বাতিল করা যায় না, ভাগ করে দেওয়া যায় না কিংবা অন্য কারও কাছে হস্তান্তর করা যায় না।”
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মাচাদোর দেশে ফেরার অনুকূল পরিস্থিতি তৈরিতে রাজনৈতিক সমঝোতার আলোচনার ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, “মিস মাচাদোর নিরাপদে ভেনেজুয়েলায় ফেরার অনুকূল পরিস্থিতি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে পরিচালিত সমঝোতা আলোচনার ফল।” তাঁর দাবি, এসব আলোচনার মাধ্যমে ইতোমধ্যে শত শত রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে এবং বিরোধী রাজনীতিকদের শত শত ব্যক্তিও নির্বাসন থেকে দেশে ফিরেছেন।
রুবিও আরও বলেন, সব রাজনৈতিক পক্ষের এই আলোচনাকে সমর্থন করা উচিত। তাঁর মতে, গত ৩০ বছরের মধ্যে শান্তিপূর্ণভাবে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন এবং স্থায়ী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য ভেনেজুয়েলা এবারই সবচেয়ে ভালো সুযোগ পেয়েছে।