![]()
ইবি রিপোর্ট
শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কম দামে শেয়ার কেনার পাশাপাশি কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করাও জরুরি। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) উল্লেখিত তথ্য অনুযায়ী, যমুনা ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংকের মূল্য-আয় অনুপাত (পিই রেশিও) তুলনামূলক কম। তবে কম পিই রেশিও থাকলেই কোনো শেয়ারে লোকসানের ঝুঁকি কম বা মুনাফা নিশ্চিত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের অন্যতম উদ্বেগ হলো সঞ্চিত অর্থ হারানোর ঝুঁকি। এ কারণে অনেকেই কম দামের শেয়ার, নিয়মিত মুনাফা এবং লভ্যাংশ দেওয়া কোম্পানি খোঁজেন। বিশেষ করে ব্যাংকের শেয়ারের পিই রেশিও কম হলে সেটিকে সম্ভাব্য বিনিয়োগের সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করেন অনেকে।
তবে কম দামের আড়ালে কোম্পানির দুর্বল আর্থিক অবস্থা, আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা কিংবা ঋণ আদায়ে সংকট থাকতে পারে। আবার ভালো কোম্পানির শেয়ারও অতিরিক্ত দামে কিনলে লোকসান হতে পারে। তাই বিনিয়োগের আগে কোম্পানির আয়, মুনাফা, ঋণ, লভ্যাংশ এবং আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
কম পিই রেশিওর পাঁচ ব্যাংক
ডিএসইর উল্লেখিত তথ্য অনুযায়ী, পাঁচটি ব্যাংকের পিই রেশিও হলো—
- যমুনা ব্যাংক: ২.৮৮
- শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক: ৩.২৩
- সাউথইস্ট ব্যাংক: ৩.৪৫
- এনসিসি ব্যাংক: ৩.৫১
- প্রাইম ব্যাংক: ৪.১৪
এই অনুপাতগুলো বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংকগুলোর শেয়ার প্রাথমিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। তবে তালিকাটি শেয়ার কেনার সুপারিশ নয়। পিই রেশিও নির্ভর করে শেয়ারের বাজারদর ও শেয়ারপ্রতি আয়ের ওপর। ফলে বাজারদর কিংবা আয়ের হিসাব পরিবর্তিত হলে এ অনুপাতও বদলে যেতে পারে। বিনিয়োগের আগে সর্বশেষ তথ্য যাচাই করা জরুরি।
কম পিই রেশিও মানেই কি ভালো শেয়ার?
কোনো কোম্পানির শেয়ারের বাজারদরকে শেয়ারপ্রতি আয় দিয়ে ভাগ করলে পিই রেশিও পাওয়া যায়। উদাহরণ হিসেবে, একটি শেয়ারের দাম ৫০ টাকা এবং বার্ষিক শেয়ারপ্রতি আয় ১০ টাকা হলে পিই রেশিও হবে ৫।
একই খাতের দুটি কোম্পানির মধ্যে একটির পিই রেশিও ৪ এবং অন্যটির ৮ হলে প্রথম কোম্পানির শেয়ার তুলনামূলক সস্তা মনে হতে পারে। কিন্তু প্রথম কোম্পানির মুনাফা কমতে থাকলে, খেলাপি ঋণ বাড়লে কিংবা ভবিষ্যৎ আয় নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে কম পিই রেশিও বিনিয়োগকারীর জন্য সুরক্ষা নিশ্চিত করে না।
অন্যদিকে, কোনো কোম্পানির আয় ধারাবাহিকভাবে বাড়লে, আর্থিক অবস্থা শক্তিশালী থাকলে এবং ব্যবসার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ভালো হলে বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলক বেশি পিই রেশিও দিতেও আগ্রহী হতে পারেন।
অর্থাৎ, শেয়ারের দাম কম কি না, তা দেখার পাশাপাশি কেন কম, সেটিও বোঝা জরুরি। কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা, ভবিষ্যৎ আয় এবং বাজারদরের যৌক্তিকতা বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
ব্যাংকের শেয়ারে বিনিয়োগে সতর্কতা কেন?
ব্যাংকের মুনাফা দেখেই তার আর্থিক সক্ষমতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। ঋণ থেকে কত আয় হচ্ছে, কত ঋণ নিয়মিত আদায় হচ্ছে, খেলাপি ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত প্রভিশন রাখা হয়েছে কি না এবং মূলধন পরিস্থিতি কেমন—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখিত বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুনের শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। জুন পর্যন্ত তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছিল ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ।
তবে পুরো ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি দিয়ে কোনো নির্দিষ্ট ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা বিচার করা ঠিক নয়। প্রতিটি ব্যাংকের সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে।
ব্যাংকের মুনাফা বাড়লেও সেই আয়ের কতটা মূল ব্যাংকিং ব্যবসা থেকে এসেছে, তা দেখা প্রয়োজন। ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ থেকে আয়, ঋণের সুদ আদায়, আমানতের ব্যয় এবং খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে মুনাফার স্থায়িত্ব বিচার করা উচিত। একইভাবে, হিসাবের মুনাফা বাড়লেই বেশি নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি হয় না।
শেয়ার কেনার আগে পাঁচটি বিষয় যাচাই করুন
১. পিই রেশিও কম হওয়ার কারণ বুঝুন
শুধু কম পিই রেশিও দেখে শেয়ার কিনবেন না। কোম্পানির আয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, নাকি এককালীন আয়ের কারণে মুনাফা বেশি দেখাচ্ছে, তা যাচাই করুন। একই খাতের অন্য কোম্পানির সঙ্গে তুলনা করুন।
২. গত তিন বছরের মুনাফা দেখুন
গত তিন বছরের বার্ষিক প্রতিবেদন ও সর্বশেষ ত্রৈমাসিক আর্থিক বিবরণী পর্যালোচনা করুন। শেয়ারপ্রতি আয়, মুনাফা এবং মূল ব্যবসা থেকে আয়ের প্রবণতা দেখুন। ব্যাংকের ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণ, প্রভিশন ঘাটতি, মূলধন পর্যাপ্ততা ও ঋণ আদায়ের সক্ষমতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
৩. লভ্যাংশের ইতিহাস যাচাই করুন
গত তিন থেকে পাঁচ বছরে কোম্পানিটি কী পরিমাণ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে, তা দেখুন। শুধু ঘোষিত লভ্যাংশ নয়, প্রকৃত বিতরণের তথ্যও যাচাই করুন। শেয়ারের বাজারদর কমে যাওয়ায় লভ্যাংশের হার বেশি দেখাতে পারে। তাই বেশি লভ্যাংশের হার দেখেই বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
৪. আর্থিক প্রতিবেদন ও নিরীক্ষকের মতামত পড়ুন
কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদনে নিরীক্ষকের মতামত, হিসাবের সীমাবদ্ধতা এবং গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দেখুন। ব্যাংকের ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণ, প্রভিশন ঘাটতি ও মূলধন পরিস্থিতির পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনাও যাচাই করুন।
৫. সব টাকা একটি শেয়ারে বিনিয়োগ করবেন না
একটি কোম্পানির শেয়ার ভালো মনে হলেও তার দাম কমতে পারে। নিজের আর্থিক সামর্থ্য ও ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা অনুযায়ী বিভিন্ন কোম্পানি ও খাতে বিনিয়োগ ভাগ করে রাখুন। জরুরি প্রয়োজনে লাগবে এমন অর্থ কিংবা ধার করা টাকা দিয়ে শেয়ার কেনা এড়িয়ে চলুন।
বিনিয়োগের তথ্য পাবেন কোথায়?
ডিএসইর ওয়েবসাইটে শেয়ারের বাজারদর, পিই রেশিও, কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন ও মূল্যসংবেদনশীল তথ্য পাওয়া যায়। পাশাপাশি কোম্পানির নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) বিজ্ঞপ্তিও যাচাই করা উচিত।
কোনো কোম্পানির সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশিত না হলে পুরোনো তথ্যের ভিত্তিতে বিনিয়োগ করা ঝুঁকিপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব, অযাচাইকৃত পরামর্শ কিংবা দ্রুত লাভের প্রলোভনেও সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের লক্ষ্য শুধু কম দামে শেয়ার কেনা নয়; বরং যুক্তিসংগত দামে ভালো ব্যবসার অংশীদার হওয়া। যমুনা ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংকের মতো কম পিই রেশিওর শেয়ারগুলো প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে রাখা যেতে পারে। তবে বিনিয়োগের আগে প্রতিটি ব্যাংকের হালনাগাদ আর্থিক তথ্য, খেলাপি ঋণ, মুনাফার উৎস ও লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা যাচাই করতে হবে।
শেয়ারবাজারে লোকসান এড়ানোর কোনো নিশ্চিত সূত্র নেই। তবে তথ্য যাচাই করে বিনিয়োগ, ঝুঁকি ভাগ করে নেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুসরণ করলে ভুল সিদ্ধান্তের আশঙ্কা কমানো সম্ভব।