• হোম > অর্থনীতি | জাতীয় | দেশজুড়ে > আমানত ফেরত দিতে পারছে না পদ্মা ব্যাংক, তবু মাসে ৬০ লাখ টাকা বাড়িভাড়া

আমানত ফেরত দিতে পারছে না পদ্মা ব্যাংক, তবু মাসে ৬০ লাখ টাকা বাড়িভাড়া

  • রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৭:২৪
  • ১৯

---

ইবি রিপোর্ট

আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে হিমশিম খাচ্ছে পদ্মা ব্যাংক। অথচ ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফাতের পরিবারের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বলে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) চিহ্নিত করা একটি প্রতিষ্ঠানের ভবন ভাড়া বাবদ প্রতি মাসে ৬০ লাখ টাকা পরিশোধ করা হচ্ছে। ব্যাংকটির আর্থিক সংকট, বিপুল খেলাপি ঋণ ও তারল্য ঘাটতির মধ্যে এই ভাড়া চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ব্যাংকের ধানমন্ডি শাখায় ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মেয়াদপূর্তির পর দুই লাখ টাকা তুলতে গিয়ে ব্যর্থ হন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অফিস সহকারী জামাল হোসেন। এক বছরের বেশি সময় পার হলেও তিনি সেই অর্থ ফেরত পাননি। তাঁর মতো বহু আমানতকারীর অর্থ আটকে রয়েছে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ব্যাংকটিতে ব্যক্তি পর্যায়ের আমানতকারীদের পাওনা ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি ছিল।

পদ্মা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়, একটি সাধারণ শাখা ও একটি ইসলামিক ব্যাংকিং শাখার জন্য গুলশান-২-এর ফাইন্যান্স স্কয়ার ভবনে প্রায় ২৪ হাজার বর্গফুট জায়গা ভাড়া নেওয়া হয়েছে। ২০২২ সালে চুক্তির সময় প্রতি বর্গফুটের ভাড়া নির্ধারণ করা হয় ২৫০ টাকা। সিআইডির তদন্ত অনুযায়ী, ভবনটির জন্য অগ্রিম হিসেবে ১৪ কোটি টাকার বেশি পরিশোধ করেছিল ব্যাংকটি।

তদন্তে বলা হয়েছে, ভবনটির সঙ্গে নাফিজ সরাফাতের স্ত্রী আঞ্জুমান আরা শহীদ ও তাঁদের নাবালক ছেলে রাহিব সাফওয়ান সরাফাত চৌধুরীর স্বার্থসংশ্লিষ্টতা রয়েছে। সম্পত্তিটির ওপর কার্যত নাফিজের নিয়ন্ত্রণ ছিল বলেও তদন্তকারীদের দাবি। ২০২২ সালে ‘ডায়নেস্টি হোমস’-এর সঙ্গে করা তিনটি চুক্তির আওতায় ব্যাংকটি মোট ১৪ কোটি ৭ লাখ টাকা অগ্রিম দেয় বলে সিআইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২১ সালের জানুয়ারিতে নিবন্ধিত ডায়নেস্টি হোমসের অনুমোদিত মূলধন ছিল ১০ কোটি টাকা, তবে পরিশোধিত মূলধন ছিল মাত্র দুই লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানটি ৫২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০ তলা বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের কাজ হাতে নেয়। সিআইডির অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করে ব্যাংকের ভেতরের সুবিধাভোগীদের স্বার্থে নিজস্ব সম্পত্তি প্রকল্পে অর্থ প্রবাহিত করা হয়েছিল।

বিনিয়োগের অর্থও আটকে

পদ্মা ব্যাংক ‘বাংলাদেশ ফিক্সড ইনকাম ইনভেস্টমেন্ট স্পেশাল পারপাস ভেহিকল’ বা বিএফআইএসপিভিতে বিনিয়োগ করা ২১৯ কোটি টাকার বেশি অর্থও উদ্ধার করতে পারেনি। তহবিলটি পরিচালনা করে রেস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট, যার চেয়ারম্যান নাফিজ সরাফাত। ২০১৫ ও ২০১৬ সালে তিনি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে থাকার সময় বিনিয়োগটি করা হয়।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে বেআইনি শেয়ার লেনদেনের প্রমাণ পাওয়ার পর বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) রেসের একটি বিকল্প তহবিলের আওতায় পরিচালিত সব ধরনের লেনদেন স্থগিত করে। পরে ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর নাফিজ সরাফাত, তাঁর পরিবারের সদস্য ও এক সহযোগীর বিরুদ্ধে ১ হাজার ৬১৩ কোটি টাকার বেশি অর্থ পাচারের অভিযোগে মামলা করে সিআইডি।

ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী মো. তালহা স্বীকার করেছেন, আমানতকারীদের পাওনা পরিশোধের মতো পর্যাপ্ত তারল্য ব্যাংকটির হাতে নেই। তাঁর ভাষ্য, ঋণ আদায় থেকে যে অর্থ আসে, তা দিয়ে অল্প অল্প করে পাওনা মেটানোর চেষ্টা করা হয়। কর্মীদের বেতন হিসাবে জমা দেখানো হলেও নগদ অর্থের অভাবে তাঁরা পুরো টাকা তুলতে পারেন না।

তালহা নিশ্চিত করেছেন, ডায়নেস্টি হোমসের হিসাবে প্রতি মাসে ৬০ লাখ টাকা ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। তাঁর ব্যাখ্যা, অন্য ভবনে স্থানান্তরিত হলে নতুন অগ্রিম ও সাজসজ্জার ব্যয় বহন করতে হবে, যা ব্যাংকের পক্ষে সম্ভব নয়। বর্তমান ভবন ছেড়ে গেলে আগের বিনিয়োগের অর্থও হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।

আর্থিক সূচকে গভীর সংকট

২০২৫ সালের নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, পদ্মা ব্যাংকের লোকসান হয়েছে ৯ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে ব্যাংকটির ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধন সংরক্ষণের অনুপাত (সিআরএআর) ছিল ঋণাত্মক ১৮৭ দশমিক ১৪ শতাংশ, যেখানে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত হার ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ২২৪ কোটি টাকায়।

ব্যাংকটির তারল্য ঘাটতি ছিল ৫ হাজার ১২২ কোটি টাকা এবং ক্যাশ রিজার্ভ রিকোয়ারমেন্ট (সিআরআর) ঘাটতি ২৩২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। মোট ৫ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকার বিতরণ করা ঋণের ৯৪ দশমিক ৫১ শতাংশ খেলাপি বা মন্দ ঋণে পরিণত হয়েছে। একই সময়ে ব্যাংকটির নিট সুদের আয় ছিল ঋণাত্মক ৭২২ কোটি ৩ লাখ টাকা।

সিআইডির তদন্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২২ সালের ১৫ জুন জারি করা বিআরপিডি সার্কুলার ১২ লঙ্ঘনের অভিযোগও উঠে এসেছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, বার্ষিক সাধারণ সভায় বিষয়টি প্রকাশ করা হলে এবং ভাড়া বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষ থেকে জায়গা ভাড়া নেওয়ার ক্ষেত্রে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে এতে ফৌজদারি অপরাধের সংশ্লিষ্টতা থাকলে বিষয়টি আলাদা।

এদিকে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদত্যাগ করার পর থেকে পদ্মা ব্যাংক স্থায়ী এমডি ছাড়াই চলছে। ব্যাংকটির ভারপ্রাপ্ত নেতৃত্বের নিয়োগ প্রস্তাবও বাংলাদেশ ব্যাংক এখনো অনুমোদন করেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্যাংকটির এক পর্ষদ সদস্যের ভাষ্য, ন্যূনতম স্থিতিশীলতা ফেরাতে অন্তত ৮ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখনো জরুরি তারল্য সহায়তা দেয়নি। নিরীক্ষকেরা সতর্ক করেছেন, ক্রমবর্ধমান আর্থিক ঘাটতি ব্যাংকটির টিকে থাকার সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/20313 ,   Print Date & Time: Sunday, 25 October 2026, 01:22:48 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh