• হোম > আন্তর্জাতিক | ইউরোপ | বিদেশ > ফ্রান্সে বিক্ষোভ ঘিরে সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার প্রায় এক হাজার

ফ্রান্সে বিক্ষোভ ঘিরে সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার প্রায় এক হাজার

  • রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৭
  • ১৫

---

 

ইবি আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও বিদ্যালয়গুলোর বেহাল অবস্থা নিয়ে চলমান বিক্ষোভে শনিবারও লাখো মানুষ অংশ নিয়েছেন। দিনভর শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির পর বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। দিনের শেষভাগে প্রায় এক হাজার মানুষকে গ্রেপ্তারের কথা জানায় দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

শনিবারের সংঘর্ষের পরও গত সপ্তাহের মতো বড় আকারের দাঙ্গা ও লুটপাট এড়াতে পেরেছে ফরাসি কর্তৃপক্ষ। গত সপ্তাহের সহিংসতায় বহু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাট চালানো হয়েছিল এবং বিভিন্ন ভবনে আগুন দেওয়া হয়েছিল।

দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, শনিবারের বিক্ষোভে প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ অংশ নেন। তবে ট্রেড ইউনিয়নগুলোর দাবি, বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লাখ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি বেশ কয়েকটি শহরে বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।

শনিবার প্যারিসের ‘পোর্ত দ্য ইতালি’ থেকে ‘পোর্ত দ্য ভিনসেন্স’ পর্যন্ত আয়োজিত মিছিলটি বেশির ভাগ সময় শান্তিপূর্ণ ছিল। তবে কর্মসূচির শেষ পর্যায়ে বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের এমন একটি বিশেষ এলিট বাহিনীও অংশ নেয়, যারা সাধারণত সংগঠিত অপরাধ ও সন্ত্রাসবাদ দমনে কাজ করে।

সংঘর্ষের সময় কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে অস্থায়ী ব্যারিকেড তৈরি করতে এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন বস্তু ছুড়তে দেখা যায়। অন্যদিকে, একটি গাড়ির শোরুমের জানালার কাচ ভাঙার চেষ্টা করা মুখোশধারী যুবকদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে।

এএফপি জানিয়েছে, ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেট নুনেজ বলেন, ‘মিছিলের পেছনের অংশে কয়েক হাজার উগ্রপন্থী কর্মী জড়ো হয়েছিল, যাদের মধ্যে প্রায় ৫০০ জনকে দাঙ্গাবাজ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।’

দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী মার্সেইলে ময়লার কনটেইনারে আগুন দেওয়া হয়। রাস্তা অবরোধ করতে ব্যবহার করা হয় ধাতব পাত। শহরটির একটি জ্বলন্ত ব্যারিকেডের ওপর দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি গাড়ি চলাচল করতে দেখা যায়।

দক্ষিণের আরেক শহর বর্দোতে কালো পোশাক ও মুখ ঢাকা কয়েকজন বিক্ষোভকারী একটি ভবনের কাঠের তক্তা খুলে রাস্তার ওপর ব্যারিকেড তৈরি করেন। অন্যদিকে, লিওঁ শহরের প্রশাসন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা একটি এলাকায় জড়ো হওয়া লোকজনকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ার গ্যাসের গ্রেনেড ব্যবহার করে।

লিওঁর এক বিক্ষোভকারী জানান, তাঁদের দলে প্রায় ১৫০ জন ছিলেন। তাঁদের অধিকাংশই মাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তাঁর ভাষ্য, ‘এরপর কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ টিয়ার গ্যাস ছোড়া শুরু হয়। রাস্তায় তখন প্রায় কিছুই দেখা যাচ্ছিল না।’

দিনের শেষভাগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজ জানান, প্রায় এক হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। মন্ত্রী জানান, সংঘর্ষে দুজন ব্যক্তি গুরুতর আহত হয়েছেন। তাঁদের একজন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর তুলুজে এবং অন্যজন মধ্য ফ্রান্সের ক্লেমো-ফেহ শহরে আহত হন।

প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ চলতি সপ্তাহের শুরুতে নির্দেশ দেন, কেবল অনুমোদিত ট্রেড ইউনিয়নগুলোর আয়োজিত বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হবে। এর আগে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় দ্রুত বিচার আদালতের মাধ্যমে শত শত মানুষকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

গত সপ্তাহের সহিংসতায় পুলিশ পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খায়। তখন শত শত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাট এবং বিভিন্ন ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ফ্রান্সজুড়ে দুই হাজারের বেশি দোকান ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। ফ্রান্সের ‘চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি’ (সিসিআই) জানিয়েছে, ক্ষতির পরিমাণ কয়েকশ মিলিয়ন ইউরো হতে পারে।

এএফপির তথ্য অনুযায়ী, পুলিশের টিয়ার গ্যাস বা সাউন্ড গ্রেনেডের আঘাতে এক বিক্ষোভকারীর হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। একই সহিংসতায় প্রায় এক হাজার পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। পরবর্তী সময়ে ফরাসি কর্তৃপক্ষ প্যারিসসহ কয়েকটি শহরে রাতের বেলায় কারফিউ জারি করতে বাধ্য হয়।

প্যারিসের এক বিক্ষোভকারী জানান, মানুষ তীব্র হতাশার মধ্যে রয়েছে। মাখোঁ ক্ষমতায় আসার পর থেকে তাঁরা অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

২৬ বছর বয়সী ওই নারী বলেন, ‘তারা আমাদের মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য করে। আমাদের টাকা নিয়ে নেয়, প্রচুর কর চাপায়, অথচ আমরা কিছুই বলতে পারি না। আজ আমরা রাজপথে নেমেছি কারণ এটি অনেক দীর্ঘ সময় ধরে চলছে এবং সীমার বাইরে চলে গেছে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মুখোশ পরা দুই কিশোর বিক্ষোভকারীও জানায়, তাদের প্রজন্ম হতাশায় ভুগছে এবং সরকারের কাছ থেকে অবহেলিত বোধ করছে। গত শনিবারের লুটপাট নিয়ে তাদের একজন বলেন, ‘আমার মনে হয় লুটপাট সত্যিই কোনো ভালো বিষয় নয়। কিন্তু দারিদ্র্য এবং পুলিশের সহিংসতার কারণেই এমনটা ঘটছে।’

তিনি আরও বলেন, আন্দোলনকারীরা তাঁদের দাবির জবাব না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যেতে চান। তাঁদের লক্ষ্য ফ্রান্সে পরিবর্তন আনা।

এদিকে উত্তরাঞ্চলীয় শহর ওলিও-তে উগ্র-ডানপন্থী দল ‘ন্যাশনাল র‌্যালি’র বিরুদ্ধে আয়োজিত এক সমাবেশে প্রায় ১৩ হাজার মানুষ অংশ নেন। সমাবেশটি শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়।

ফ্রান্সের মতো জীবনযাত্রার ব্যয় ও অন্যান্য সমস্যা ঘিরে শনিবার ইউরোপের আরও কয়েকটি শহরে বিক্ষোভ হয়েছে। আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় সরকারবিরোধী হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে ছত্রভঙ্গ করতে দাঙ্গা পুলিশ টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে। বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসেও সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।

উত্তর ইতালির মিলানে শত শত সেনাসদস্য ও পুলিশ সদস্যের সমন্বয়ে বড় ধরনের নিরাপত্তা অভিযান চালানো হয়। এর মাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের শহরে জড়ো হতে বাধা দেওয়া হয়। গত সপ্তাহের সহিংসতার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থেকেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। ওই সময় বিক্ষোভকারীরা আগুন জ্বালানো, কাচ ভাঙা ও দোকানপাটে লুটপাটের মতো ঘটনা ঘটিয়েছিলেন।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রতিবাদে গত সপ্তাহের আন্দোলনে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। সপ্তাহজুড়ে চলা শিক্ষার্থী আন্দোলনের পর এই বিক্ষোভ আরও তীব্র হয়। পরবর্তী সহিংসতায় আড়াই হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়।

আগামী ছয় মাস পর ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। নির্বাচন সামনে রেখে চলমান বিক্ষোভের প্রভাব রাজনৈতিক অঙ্গনেও পড়েছে। শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা পরিস্থিতির জন্য সরাসরি মাখোঁ ও তাঁর মন্ত্রীদের দায়ী করেছেন।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/20273 ,   Print Date & Time: Sunday, 25 October 2026, 07:21:56 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh