• হোম > জাতীয় | বাংলাদেশ | শিক্ষা > মুখস্থবিদ্যা কমাতে নতুন উদ্যোগ, পাঠ্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে চার বই

মুখস্থবিদ্যা কমাতে নতুন উদ্যোগ, পাঠ্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে চার বই

  • শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪২
  • ১৩

---

ইবি রিপোর্ট

মুখস্থনির্ভর পড়াশোনা ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষার প্রচলিত ধারা থেকে শিক্ষার্থীদের বের করে আনতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণির পাঠ্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে চারটি নতুন বই। খেলাধুলা, সংস্কৃতি, আনন্দময় শিখন এবং কারিগরি দক্ষতাকে গুরুত্ব দিয়ে বইগুলো তৈরি করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।

নতুন বইগুলো হলো চতুর্থ শ্রেণির ‘খেলাধুলা’ ও ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণির ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’। শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ, নৈতিক মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা এবং বাস্তব জীবনের কাজের দক্ষতা বাড়ানোই এসব বইয়ের লক্ষ্য। চারটি বইয়ের প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ কপি ছাপানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দীর্ঘ ১৫ বছরের রূপকল্প, গবেষণা ও নির্দেশনার ভিত্তিতে শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও আনন্দময়, বাস্তবমুখী এবং নৈতিক মূল্যবোধনির্ভর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, ‘রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার আলোকে বহুমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। এরই অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় সংস্কারে মনোনিবেশ করেন। শিক্ষাব্যবস্থাকে আনন্দময়, বাস্তবমুখী ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন করে তুলতে দীর্ঘ বছর উনি (প্রধানমন্ত্রী) কাজ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে যে চিন্তাধারা, অভিজ্ঞতা ও গবেষণা পরিচালনা করেছেন- তারই বহিঃপ্রকাশ হিসেবে পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা হচ্ছে নতুন এই বইগুলো।’

তিনি আরও বলেন, গত ১৫ বছরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কাজ করে তিনি বুঝেছেন, শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক শিষ্টাচার, পারিবারিক সংস্কৃতি ও সুনাগরিকের গুণাবলি গড়ে তোলার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাও প্রধানমন্ত্রীর লক্ষ্য। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর তাঁর নির্দেশনায় এনসিটিবিকে যুক্ত করে এ কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হয়। এ জন্য একটি দল গঠন করা হয়েছে, যেখানে নীতিমালা প্রণয়নে প্রধানমন্ত্রীকে সহযোগিতা করা ব্যক্তিদের পাশাপাশি শিক্ষাবিদদেরও সম্পৃক্ত করা হয়েছে। ধারাবাহিক আলোচনা ও বৈঠকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর রূপকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে।

এনসিটিবি সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী আনন্দ, খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও হাতে-কলমে কারিগরি দক্ষতার সমন্বয়ে বইগুলো প্রণয়ন করা হয়েছে। আগামী ২৫ অক্টোবর জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসি) সভায় এগুলোর চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার কথা রয়েছে।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বাসসকে বলেন, নতুন চারটি পাঠ্যপুস্তকের পাণ্ডুলিপি প্রণয়ন ও যাচাইয়ের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। ২৫ অক্টোবর এনসিসির সভায় অনুমোদনের পরই বইগুলোর বিষয়বস্তু মুদ্রণের জন্য প্রেসে পাঠানো হবে।

এনসিটিবি জানায়, গত ১২ জুলাই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে চার মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কর্মশালায় বইগুলোর রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়। পরে বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত পাণ্ডুলিপি তৈরি করা হয়েছে। এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মাদ আবু নাসের টুকু জানান, অনুমোদন পাওয়ার পর আগামী ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় দেড় কোটি বইয়ের মুদ্রণকাজ শেষ করার আশা রয়েছে।

চতুর্থ শ্রেণির ‘খেলাধুলা’ বইটি ১৪টি অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে। শিশুদের সুস্থ জীবনযাপন ও খেলাধুলায় আগ্রহী করে তোলার পাশাপাশি এতে ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি, ব্যাডমিন্টন, সাঁতার, অ্যাথলেটিকস ও দাবার মৌলিক নিয়ম শেখানো হবে। কারাতে, জুডো ও তায়কোয়ান্দোর মতো আত্মরক্ষার কৌশলও থাকছে বইটিতে।

খেলার মাঠে বা দৌড়ানোর সময় কেটে যাওয়া, মচকানো, নাক দিয়ে রক্ত পড়া ও হিট স্ট্রোকের মতো পরিস্থিতিতে করণীয় ছবি দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রীর ব্যবহার ও আঘাত প্রতিরোধের কৌশলও শিখবে। পাশাপাশি পুষ্টি, সামাজিক দক্ষতা ও দেশপ্রেমের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বইটির প্রথম অধ্যায়ে ‘স্বপ্ন যখন আকাশ ছোঁয়া’ শিরোনামে একটি অনুপ্রেরণামূলক গল্প রয়েছে। এতে প্রত্যন্ত গ্রামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আয়মান স্যার ও তাঁর সহকর্মী সাদিয়া আপার উদ্যোগে মেয়েদের ফুটবল দল গঠনের কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে। সামাজিক বাধা ও কুসংস্কার পেরিয়ে মেহজাবিনসহ কয়েকজন শিক্ষার্থীর ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও বিভাগ অতিক্রম করে জাতীয় পর্যায়ে বিজয়ী হওয়ার গল্পের মাধ্যমে খেলাধুলার সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে। এতে খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার মাধ্যমে আর্থসামাজিক পরিবর্তন ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের বিষয়টিও উঠে এসেছে।

এনসিটিবি চেয়ারম্যান বলেন, পড়াশোনাকে একমুখী ও ক্লান্তিকর হওয়া থেকে রক্ষা করার লক্ষ্যেই প্রথমবারের মতো ‘খেলাধুলা’ বইটি প্রণয়ন করা হয়েছে।

অন্যদিকে, ১১টি অধ্যায়ে তৈরি ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ বইয়ে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও লোকজ সংস্কৃতি তুলে ধরা হয়েছে। এতে ভাষা, পোশাক, শিল্পকলা, খাদ্যাভ্যাস, সামাজিক রীতিনীতি এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনধারা বর্ণনা করা হয়েছে। বাংলা বর্ণমালা চর্চা, বিদ্যালয়ের উৎসব, জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও পিঠা-পুলির পাশাপাশি বাবা-মায়ের যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং পরিবারের সদস্যদের পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়ও থাকছে।

বইটির একটি বিশেষ অধ্যায়ে শিশু-কিশোরদের প্রতিভা অন্বেষণমূলক আয়োজন ‘নতুন কুঁড়ি’র ইতিহাস, ১৯৭৬ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগ এবং বিজয়ীদের দুর্লভ ছবি সংযুক্ত করা হয়েছে।

ষষ্ঠ শ্রেণির ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বইটি ছয়টি অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো ভয়মুক্ত ও আনন্দঘন পরিবেশে শিক্ষার্থীদের শেখার সুযোগ তৈরি করা। প্রচলিত পরীক্ষাকেন্দ্রিক পদ্ধতির বাইরে অভিজ্ঞতা, পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া ও সহপাঠক্রমিক কার্যক্রমের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জনের পদ্ধতি এতে তুলে ধরা হয়েছে।

বইটি শিক্ষার্থীদের পাঠ্যভার কমাতে সহায়তা করবে। নিজেদের স্বাস্থ্য, চারপাশের পরিবেশ ও দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সঙ্গে পাঠকে যুক্ত করে শেখার সুযোগ তৈরি করা হবে। এতে শেখাকে শুধু মুখস্থ করা কিংবা পরীক্ষার প্রস্তুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জীবন, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, সৃজনশীলতা ও পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে জ্ঞান অর্জনের ধারণা দেওয়া হয়েছে।

আটটি অধ্যায়ে প্রণীত ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ বইয়ের লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা তৈরি করা। শুধু কী জানা আছে, তা নয়; বরং শিক্ষার্থী বাস্তবে কী করতে পারে, সেই সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

কারিগরি শিক্ষার পরিচিতি, চারপাশের প্রযুক্তি ও নতুন বিশ্ব, ছোট উদ্যোগের সম্ভাবনা, প্রযুক্তিনির্ভর পরিবর্তন, সবুজ প্রযুক্তি এবং টেকসই জীবনযাপনের মতো বিষয় বইটিতে স্থান পেয়েছে। বাস্তব জীবনের কারিগরি সমস্যা শনাক্ত করা এবং প্রযুক্তির সহায়তায় সেগুলোর মৌলিক সমাধান খোঁজার ধারণাও এতে থাকবে। চারটি বইয়েই শব্দকোষের মতো বিশেষ অধ্যায় যুক্ত করা হয়েছে।

মাহ্দী আমিন জানান, চতুর্থ শ্রেণি থেকে শুরু হতে যাওয়া খেলাধুলা ও সংস্কৃতি বিষয় দুটি পরবর্তী সময়ে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে, ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা হবে।

এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. শওকত আলী খান বাসসকে বলেন, নতুন চারটি পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে গিয়ে আনন্দময় পরিবেশে বাস্তবমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাবে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/20205 ,   Print Date & Time: Saturday, 24 October 2026, 07:56:24 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh