• হোম > জাতীয় | বাংলাদেশ > মিয়ানমারে সার পাচার, বিনিময়ে দেশে ঢুকছে ইয়াবা ও অস্ত্র

মিয়ানমারে সার পাচার, বিনিময়ে দেশে ঢুকছে ইয়াবা ও অস্ত্র

  • শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১১
  • ৩০

---

ইবি রিপোর্ট

দেশের কৃষকদের জন্য বরাদ্দ সার পাচার হয়ে যাচ্ছে মিয়ানমারে। বিনিময়ে বাংলাদেশে ঢুকছে ইয়াবা, আইসসহ বিভিন্ন মাদক ও আগ্নেয়াস্ত্র। কক্সবাজার, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, যশোর ও সাতক্ষীরার সীমান্তপথ ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ চক্রের এই অবৈধ বাণিজ্য চললেও সংকটে পড়ছেন দেশের প্রান্তিক কৃষকেরা। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দিয়েও কোথাও কোথাও সার পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি সারের সংকটের কারণ তুলে ধরে কৃষি মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে প্রতিবেদন দিয়েছে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা। এতে বলা হয়েছে, সরকারি ভর্তুকির কারণে ভারতে তুলনায় বাংলাদেশে সারের দাম কম। এই ব্যবধান কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু ডিলার ও পরিবহন ব্যবসায়ীর যোগসাজশে সীমান্ত দিয়ে সার পাচার হচ্ছে। মিয়ানমারে এসব সার বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে।

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, নৌকার মাঝি, সীমান্ত ও উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দা এবং ভাড়া করা লোকজনের মাধ্যমে টেকনাফ, উখিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ির বিভিন্ন পথ দিয়ে সার পাচার করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঝেমধ্যে সারবোঝাই ট্রলার, কার্গো বোট ও বহনকারীদের আটক করলেও চক্রের মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছেন। ফলে চালান জব্দ হলেও বন্ধ হচ্ছে না পাচার। সার পাচার বন্ধে কৃষি মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপ জানতে যোগাযোগ করা হলেও কৃষি সচিব সাড়া দেননি।

কোস্ট গার্ড ও বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কক্সবাজার ও বান্দরবান সীমান্ত থেকে ২ লাখ ৩৫ হাজার ৯০৮ কেজি সার জব্দ করা হয়েছে। এ ঘটনায় ১১৭ জনকে আটক করে মামলা করেছে সংস্থা দুটি।

কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লে. কমান্ডার বিএন সাব্বির আলম সুজন বলেন, অভিযানে আটক ব্যক্তিদের অধিকাংশই শ্রমিক। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করে মামলায় মূল হোতাদের আসামি করার চেষ্টা করা হয়। টেকনাফ-২ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আশিকুর রহমান জানান, হাতেনাতে আটক ব্যক্তিদের পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্য ও প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে যাঁদের নাম পাওয়া গেছে, তাঁদেরও আসামি করা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশে ১ হাজার ৩৫০ টাকা বস্তার ইউরিয়া সার মিয়ানমারে ৮ হাজার টাকায় বিক্রি করছে পাচারকারীরা। অথচ কক্সবাজারে চলতি মাসে ইউরিয়ার চাহিদা ১ হাজার ৮৪৩ টন হলেও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২ হাজার ৩৪৩ টন। টিএসপি বরাদ্দ ৪৭৫ টন, ডিএপি ৭৮৯ টনের বিপরীতে ৮৮৯ টন এবং এমওপি ৩৬৮ টন। অতিরিক্ত বরাদ্দের পরও কৃষকেরা প্রয়োজনমতো সার পাচ্ছেন না।

হোয়াইক্যংয়ের কৃষক সাইফুদ্দিন মোবারক বলেন, সার পেতে ডিলারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও প্রয়োজনীয় পরিমাণ পাচ্ছেন না। টেকনাফের কৃষক আবদুল গফুরের অভিযোগ, যাঁদের জমি বেশি, তাঁরা সার পাচ্ছেন না; আবার ডিলাররা কৃষক নন এমন ব্যক্তিদের কাছেও সার বিক্রি করছেন। পরে সেগুলো মজুদ করে পাচার করা হচ্ছে।

কৃষি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, কিছু অসাধু ডিলার, কৃষক ও নৌকার মাঝি পাচারকারীদের সহায়তা করছেন। টেকনাফ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হুমায়ন কবির বলেন, মাদক, অস্ত্র ও মানবপাচারের সঙ্গে যুক্ত চক্রই সার পাচারের পেছনে রয়েছে। উখিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কামনাশিস সরকার জানান, সার বিতরণের সময় বস্তা খুলে দেওয়া হচ্ছে এবং পাচারের ঘটনায় ১২টি মামলা হয়েছে, যার দুটিতে ডিলারদের আসামি করা হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, উখিয়া ও টেকনাফের অন্তত ১৫টি পয়েন্ট দিয়ে সার পাচার হয়। স্থলপথে নজরদারি বাড়ায় পাচারকারীরা জলপথও ব্যবহার করছে। জেলা প্রশাসন ও কৃষি কর্মকর্তারা অতিরিক্ত দাম নেওয়া ও পাচারসহ বিভিন্ন অনিয়মে সীমান্ত এলাকার ১০ থেকে ১২ জন ডিলারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছেন।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক কূটনীতিক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম বলেন, রাখাইনের অধিকাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ আরাকান আর্মির হাতে এবং জান্তা সরকার সেখানে সার সরবরাহ বন্ধ রেখেছে। ফলে ওই অঞ্চলে সারের চাহিদা তৈরি হয়েছে, আর সেই সুযোগ নিচ্ছে চোরাকারবারিরা। তাঁর মতে, আরাকান আর্মি সমঝোতা ও চোরাই পথ—দুইভাবেই সার সংগ্রহের চেষ্টা করছে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/20179 ,   Print Date & Time: Friday, 23 October 2026, 08:07:40 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh