• হোম > জাতীয় | বাংলাদেশ | বিশ্ব সংবাদ > সুন্দরবনের নতুন সাত প্রজাতির ডিএনএ যুক্ত হচ্ছে আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকে

সুন্দরবনের নতুন সাত প্রজাতির ডিএনএ যুক্ত হচ্ছে আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকে

  • বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:৩২
  • ১৩

---

বাসস

সুন্দরবনের জলজ জীববৈচিত্র্য গবেষণায় নতুন অর্জন যুক্ত হতে যাচ্ছে। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলটির জলসীমায় পাওয়া পাঁচ প্রজাতির মাছ ও দুই প্রজাতির চিংড়ির ডিএনএ সিকোয়েন্স আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকের ডেটাবেজে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তুতি চলছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের উপকূলীয় জলসীমার এসব প্রজাতির জিনগত পরিচয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নথিভুক্ত হবে এবং ভবিষ্যতে এগুলো নিয়ে গবেষণার সুযোগ আরও বাড়বে।

আগামী নভেম্বর মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য এক কর্মশালায় বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রীর উপস্থিতিতে গবেষণার ফলাফল বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করবেন গবেষকেরা। এরপর সরকারি উদ্যোগে সাত প্রজাতির ডিএনএ সিকোয়েন্স আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকের ডেটাবেজে যুক্ত করা হবে।

‘সুন্দরবনের জলজ সম্পদের মূল্যায়ন’ শীর্ষক ১৬ মাসের গবেষণায় এ সাফল্য এসেছে। বাংলাদেশ সরকারের ‘সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের’ আওতায় সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ (সিএনআরএস) ও আরণ্যক ফাউন্ডেশন যৌথভাবে গবেষণাটি পরিচালনা করে। সম্প্রতি খুলনায় এক অনুষ্ঠানে গবেষণার খসড়া তথ্য প্রকাশ করা হয়।

গবেষকেরা ২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সুন্দরবনের চারটি রেঞ্জের ৬৫টি নদী ও খালে জরিপ চালান। এ ছাড়া বনের ভেতরে ৪২৪ কিলোমিটার এলাকায় নৌকায় ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। শ্যামনগর, কয়রা, মংলা ও শরণখোলার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র থেকেও তথ্য নেওয়া হয়।

গবেষক দলের প্রধান ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. এম এনামুল হক বাসসকে বলেন, গবেষণার পর পাঁচ প্রজাতির মাছ ও দুই প্রজাতির চিংড়ির ডিএনএ যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকে আপলোডের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। তবে বিষয়টি বন বিভাগের অধীন হওয়ায় আগামী নভেম্বর মাসে ঢাকায় প্রকল্পের চূড়ান্ত কর্মশালায় মন্ত্রীর উপস্থিতিতে গবেষণার ফলাফল বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হবে। পরে বন বিভাগের মাধ্যমে সরকারি প্রক্রিয়ায় এসব ডিএনএ সিকোয়েন্স ডেটাবেজে স্থান পাবে।

তিনি জানান, এর আগে সুন্দরবনের ১৪১ প্রজাতির মাছের ডিএনএ সিকোয়েন্স আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকে যুক্ত হয়েছে। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা কোরিয়ার সহযোগিতায় বন বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে ওই গবেষণা সম্পন্ন করেন। উপযুক্ত পরিবেশ ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে সুন্দরবনের জলজ সম্পদ আরও বৃদ্ধি পাবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

গবেষণায় সুন্দরবনের ৩০ প্রজাতির মাছ ও ১১ প্রজাতির খোলসযুক্ত জলজ প্রাণীর ডিএনএ বারকোড তৈরি করা হয়েছে। ৮৩টি মাছের নমুনার ডিএনএ বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশের উপকূলীয় জলসীমার জন্য নতুন পাঁচ প্রজাতির মাছ ও দুই প্রজাতির চিংড়ি নথিভুক্ত করা হয়। এর আগে এসব প্রজাতির ডিএনএ সিকোয়েন্স আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকের কোনো ডেটাবেজে ছিল না।

নতুন শনাক্ত হওয়া মাছগুলো হলো বড় আইশ পারশে, ফোটা বাটা, বার্মিজ এক ঠুঁইটা, কুলি বেলে বা চ্যাপ্টা মাথা বেলে এবং সবুজ ফোঁটা বেলে। নতুন দুই প্রজাতির চিংড়ি হলো মাকড়সা চিংড়ি ও ফোঁটা চিংড়ি পোকা।

গবেষণায় সুন্দরবনের শরণখোলা, সাতক্ষীরা, খুলনা ও চাঁদপাই—এই চারটি রেঞ্জের জলজ সম্পদের অবস্থা, প্রজনন মৌসুম এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মূল্যায়ন করা হয়। এতে দেখা গেছে, শরণখোলা রেঞ্জে সর্বাধিক ১৬৪ প্রজাতির জলজ প্রাণীর বৈচিত্র্য রয়েছে। তবে অতিরিক্ত মাছ আহরণ এবং নদী-খালে বিষ প্রয়োগের মতো অবৈধ কর্মকাণ্ডের কারণে বেশ কিছু প্রজাতির প্রাকৃতিক মজুত হুমকিতে পড়ছে।

গবেষণায় সুন্দরবনে ২৫১ প্রজাতির মাছ ও ৫১ প্রজাতির খোলসযুক্ত প্রাণীর উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। আগের গবেষণার ফলাফল যুক্ত করে এখন পর্যন্ত সুন্দরবনে মোট ৩৮২ প্রজাতির সাদা মাছ এবং ৮৮ প্রজাতির খোলসযুক্ত প্রাণীর সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব প্রাণীর মধ্যে চিংড়ি, কাঁকড়া, শামুক, ঝিনুক, অক্টোপাস ও স্কুইড রয়েছে।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জীবের বাহ্যিক গঠন ও জিনগত বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে মরফো-মলিকুলার পদ্ধতিতে প্রজাতিগুলো শনাক্ত করা হয়েছে। এতে মোট ৮৩টি মাছ ও ২৮টি ক্রাস্টাশিয়ান নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়। এর ভিত্তিতে ৩০ প্রজাতির মাছ ও ১১ প্রজাতির ক্রাস্টাশিয়ানসহ মোট ৪১টি প্রজাতির ডিএনএ বারকোড সিকোয়েন্স তৈরি করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকের রেফারেন্স সিকোয়েন্সের সঙ্গে এসব নমুনার নিউক্লিওটাইডের মিল পাওয়া গেছে ৯৮.১৯ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত। গবেষকদের মতে, এ তথ্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সুন্দরবনের জলজ প্রাণীর জিনগত পরিচয় নথিভুক্ত করার পথ তৈরি করবে। পাশাপাশি প্রজাতি সংরক্ষণ, অবৈধ শিকার প্রতিরোধ ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষার গবেষণায়ও এটি সহায়ক হবে।

গবেষণায় দেখা গেছে, অনিয়ন্ত্রিত ও অতিরিক্ত মাছ আহরণ, পোনা ধরা এবং ক্ষতিকর বিষ প্রয়োগের কারণে ভেটকি, পোয়া ও পাঙাশের মতো বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বড় মাছের সংখ্যা কমছে। জলজ সম্পদের ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিবেদনে কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নির্দিষ্ট প্রজাতি আহরণের সীমা নির্ধারণ ও নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনা, বিষ প্রয়োগ এবং ক্ষতিকর জালের ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা, প্রজননের উপযোগী খালকে সংরক্ষিত ঘোষণা এবং বননির্ভর জনগোষ্ঠীর জন্য দ্রুত বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করা।

খোদিয়াখালী, আঠারোবেকি, আরমাল ও কাগাবোগা খালকে সংরক্ষিত খাল হিসেবে ঘোষণার সুপারিশও করা হয়েছে।

সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের পরিচালক ও খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বাসসকে বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ অর্জন সুন্দরবনের গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে। গবেষণার সুপারিশ অনুযায়ী, সুন্দরবনের জলজ সম্পদ রক্ষায় স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

সুন্দরবনের জলজ প্রাণীর প্রজাতি শনাক্তকরণ ও জিনগত বৈচিত্র্য সংরক্ষণে গবেষকেরা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। ২০২০ ও ২০২১ সালের দিকে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষকেরা সুন্দরবনের মাছ, কাঁকড়া, শামুক ও ঝিনুকের ওপর ডিএনএ বারকোডিং গবেষণা পরিচালনা করেন।

ওই গবেষণায় সুন্দরবনের লোনা ও আধা-লোনা পানির প্রায় ১২০টি জেনেরা এবং ৬৫টি বিভিন্ন জলজ প্রাণীর মোট ১৮৫টি মাইটোকন্ড্রিয়াল সিকোয়েন্স ও ৫৯টি আরএনএ সিকোয়েন্সের তথ্য আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন গবেষণার ফলাফল এবং প্রস্তাবিত সংরক্ষণ উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সুন্দরবনের জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষার কাজ আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/20130 ,   Print Date & Time: Thursday, 22 October 2026, 10:34:11 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh