• হোম > অর্থনীতি | আন্তর্জাতিক | বিদেশ > সরকারি ঋণের চাপে ইউরোপের ব্যাংক খাতে নতুন উদ্বেগ

সরকারি ঋণের চাপে ইউরোপের ব্যাংক খাতে নতুন উদ্বেগ

  • বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:৪০
  • ১৫

---

ইবি আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইউরোজোনের ব্যাংকগুলোতে সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ বাড়তে থাকায় ২০১০-এর দশকের ঋণসংকটের মতো পরিস্থিতি ফিরে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত জুনের শেষে এ অঞ্চলের ব্যাংকগুলোর সরকারি বন্ডে নিট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি ইউরোয়, যা এক দশকেরও বেশি আগের ঋণসংকটের পর দ্বিগুণ। ইউরোপীয় দেশগুলোর সরকারি বন্ডের সুদহার বাড়তে থাকায় ব্যাংকগুলোর সম্ভাব্য লোকসান ও ঋণ নেওয়ার খরচ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

২০১০ সালে ইউরোজোনের আর্থিক সংকটের সময় সরকার ও ব্যাংকের মধ্যে তৈরি হওয়া ঝুঁকিপূর্ণ সম্পর্ককে ‘ডুম লুপ’ বা ঋণসংকটের দুষ্টচক্র বলা হয়। সরকারি বন্ডের দাম কমলে এসব বন্ডে বিনিয়োগ করা ব্যাংকগুলো লোকসানের মুখে পড়ে। ব্যাংককে সহায়তা দিতে সরকারকে অর্থ ব্যয় করতে হলে সরকারি ঋণ আরও বাড়তে পারে। এতে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হয় এবং ব্যাংকগুলোর ঝুঁকিও বাড়ে।

তবে এবারের পরিস্থিতিতে কিছু পার্থক্য রয়েছে। আগের সংকটের তুলনায় ব্যাংকগুলোর মূলধন বেড়েছে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি জোরদার হয়েছে। ফলে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলেও ব্যাংকগুলো তা মোকাবেলায় তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষক ও বিনিয়োগকারীরা।

ব্যাংক শেয়ারে দরপতন, উদ্বেগের কেন্দ্রে ফ্রান্স

সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপের ব্যাংক খাতের শেয়ারবাজারেও উদ্বেগের প্রভাব পড়েছে। গত ছয় সপ্তাহে এ খাতের শেয়ারের দাম কমেছে ১০ শতাংশ। একই সময়ে সামগ্রিক বাজারের দরপতন হয়েছে এর প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। এর আগে দীর্ঘ সময় ধরে দর বাড়ায় ব্যাংক খাতের শেয়ার ১৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছিল। এ সময়ে ফ্রান্সের শীর্ষ তিন ব্যাংকের শেয়ারের দাম কমেছে ১৭ শতাংশ।

ইউরোজোনের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি ফ্রান্সকে ঘিরে উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি। দেশটির সরকারি ঋণের সুদহার ২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। বড় বাজেট ঘাটতি, সামাজিক অস্থিরতা এবং আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। জনমত জরিপে কট্টর ডানপন্থী ও কট্টর বামপন্থী প্রার্থীদের এগিয়ে থাকার বিষয়টিও দেশটির অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে।

মুডিস রেটিংসের জ্যেষ্ঠ ব্যাংক বিশ্লেষক সাইমন আইনসওর্থ বলেন, দেশের আর্থিক পরিস্থিতি থেকে ব্যাংকগুলোকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন রাখা সম্ভব নয়। তাঁর মতে, ব্যাংকগুলো এখন আগের তুলনায় ভালো অবস্থানে থাকলেও সরকারি অর্থব্যবস্থার দুর্বলতা থেকে সৃষ্ট ঝুঁকি এড়াতে পারবে না।

সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ বাড়লেও মূলধনও বেড়েছে

ইউরোপের ব্যাংকগুলোর জন্য সরকারি বন্ড গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। নিয়ম অনুযায়ী, এসব বন্ডকে ঝুঁকিমুক্ত সম্পদ হিসেবে গণ্য করার সুযোগ রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার সময় জামানত হিসেবেও এগুলো ব্যবহার করা যায়।

ইউরোপীয় ব্যাংকিং কর্তৃপক্ষের (ইবিএ) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১০-এর দশকের ঋণসংকটের পর ইউরোজোনের ব্যাংকগুলোর সরকারি বন্ডে নিট বিনিয়োগ দ্বিগুণ হয়ে গত জুনের শেষে ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি ইউরোয় দাঁড়িয়েছে। তবে একই সময়ে ব্যাংকগুলোর মূলধনও বেড়েছে। ফলে সম্ভাব্য লোকসান সামাল দেওয়ার মূলধনের তুলনায় সরকারি বন্ডে বিনিয়োগের অনুপাত কমেছে।

২০১৩ সালে এ অনুপাত ছিল ২ দশমিক ৭। বর্তমানে তা ২ দশমিক ৫-এর নিচে নেমেছে। অর্থাৎ সরকারি বন্ডের দাম কমে গেলে লোকসান সামাল দেওয়ার সক্ষমতা আগের তুলনায় বেড়েছে।

ফ্রান্সের বড় ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রেও আগের সংকটের তুলনায় পরিস্থিতি ভালো। অ্যাক্সিওম অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্টসের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ডেভিড বেনামু এবং উইজডমট্রির শেয়ারবাজার কৌশলবিদ আনিকা গুপ্তার হিসাব অনুযায়ী, বড় ফরাসি ব্যাংকগুলোর সর্বোচ্চ মানের মূলধনের প্রায় ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ নিজ দেশের সরকারি ঋণে বিনিয়োগ করা আছে। ২০১১–১২ সালে ইতালির ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এ অনুপাত ১০০ শতাংশের বেশি ছিল।

হিসাবের পদ্ধতিতে ঝুঁকি সামাল দেওয়ার চেষ্টা

সরকারি বন্ডের বাজারদর কমলেও তাৎক্ষণিক লোকসান দেখানোর চাপ কমাতে ব্যাংকগুলো হিসাবের পদ্ধতি ব্যবহার করছে। ইবিএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে ইউরোজোনের ব্যাংকগুলোর মোট সরকারি বন্ডের ৪১ শতাংশ ছিল নিজ দেশের বন্ড। ২০১৩ সালে এ হার ছিল ৫০ শতাংশের বেশি।

এ ছাড়া ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা বন্ডের ৬০ শতাংশ এখন ক্রয়মূল্য অনুযায়ী হিসাব করা হয়, যা আগের তুলনায় তিন গুণ। মেয়াদ পর্যন্ত ধরে রাখার জন্য কেনা বন্ডের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্তে বাজারদর কমলেও তাৎক্ষণিকভাবে লোকসান দেখাতে হয় না। তবে নগদ অর্থের প্রয়োজন হলে ব্যাংককে এসব বন্ড বিক্রি করতে হতে পারে। তখন বাজারদরের পতন প্রকৃত লোকসানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

মর্নিংস্টার ডিবিআরএসের বিশ্লেষক মারিয়া রিভাস বলেন, হিসাবের খাতায় লোকসান না দেখালেও বিনিয়োগকারীরা ব্যাংকের বন্ডের প্রকৃত অবস্থা কীভাবে মূল্যায়ন করছেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। পরিস্থিতি সাময়িক হলে আস্থায় বড় প্রভাব নাও পড়তে পারে। কিন্তু সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে ঝুঁকি সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের ধারণা বদলে যেতে পারে।

ঋণের খরচ বাড়লে মুনাফায় চাপ

সরকারি বন্ডের সুদহার বাড়লে ব্যাংকগুলোর নিজেদের ঋণ নেওয়ার খরচও বাড়তে পারে। কারণ আর্থিক বাজারে ঋণ নিতে সাধারণত সরকারকে দেওয়া সুদহারের চেয়ে বেশি সুদ দিতে হয় ব্যাংকগুলোকে। পুরনো ঋণ পুনঃঅর্থায়নের সময় এ ব্যয় বেড়ে গেলে মুনাফা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাইকারি ঋণবাজার থেকে সবচেয়ে বেশি ঋণ নেয় ফ্রান্সের ব্যাংকগুলো। ফলে সুদহার দীর্ঘ সময় উঁচু থাকলে তাদের ব্যয় বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

তবে গ্রিসের পিরেয়াস ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী ক্রিস্টোস মেগালু মনে করেন, আগের সংকটের মতো বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা এখন কম। তাঁর মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, নীতিনির্ধারক ও ব্যাংকগুলো সংকট মোকাবেলায় বেশি প্রস্তুত এবং নিয়মিত ঝুঁকি যাচাই করছে।

সব মিলিয়ে ব্যাংকগুলোর মূলধন ও তদারকি ব্যবস্থা শক্তিশালী হলেও সরকারি ঋণের ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। বন্ডবাজারের অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে ব্যাংকের ঋণ ব্যয় বাড়তে পারে, মুনাফায় চাপ পড়তে পারে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা দুর্বল হতে পারে। তাই বর্তমান অস্থিরতা সাময়িক থাকে, নাকি নতুন করে ঋণসংকটের দুষ্টচক্র তৈরি করে—সেদিকেই নজর রাখছেন ইউরোপের আর্থিক খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/20111 ,   Print Date & Time: Thursday, 22 October 2026, 09:36:44 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh