![]()
ড. মোঃ আশফাকুল ইসলাম বাবুল
সিরিজ: ৪র্থ পর্ব
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ব্যবস্থাপনার মধ্যে আরও একটি প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক, তা হলো: আইন প্রয়োগে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা আছে কি না? প্রশ্নটির সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো, সম্পদ, লোকবলসহ জ্ঞান, উন্নত প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
যেমন, বিশাল এলাকা জুড়ে নদীতে কারেন্ট জাল দিয়ে অবৈধ মাছ শিকারের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার যে পরিমাণ লোকবল এবং জলযান থাকা প্রয়োজন, স্থানীয় প্রশাসনে তার অপ্রতুলতা রয়েছে। তাই প্রচেষ্টা থাকলেও কারেন্ট জাল দিয়ে অবৈধ মাছ শিকার নিয়ন্ত্রণের আইন সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।
আবার শুধু উন্নত প্রযুক্তি এবং শক্তিশালী নেটওয়ার্কিং ব্যবস্থার অভাব রয়েছে বিধায় অর্থ পাচার ও মানি লন্ডারিংয়ের মতো অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আমরা জানি, ট্যাক্স বিষয়ক আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার ওপর ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানের নামে সঠিকভাবে ট্যাক্স নিরূপণ এবং তা সময়মতো আদায় বহুলাংশে নির্ভর করে।
এজন্য দেশে সুনির্দিষ্ট আইন ও বিধি প্রচলিত আছে। অথচ উক্ত প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা এমন পর্যায়ে নেই, যে কারণে এখনো বড় বড় শিল্প বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ট্যাক্স নির্ধারণ এবং তা শতভাগ আদায় নিশ্চিত করা যাচ্ছে। আবার দেশের অর্থ পাচার রোধে প্রচলিত আইন বাস্তবায়নের জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতার প্রশ্নও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে লোকবল, প্রযুক্তি ও নেটওয়ার্কিং ব্যবস্থাপনায় যত বেশি সক্ষম হবে, দেশের অর্থ পাচার রোধে তারা তত বেশি ভূমিকা রাখতে পারবে।
আইনের সেবাভোগী
কোন আইন বাস্তবায়নে যে কিনা সুবিধা ভোগ করে, এক অর্থে আইন প্রণেতা, বাস্তবায়নকারী এবং প্রান্তিক জনসাধারণ সকলেই এ শ্রেণিভুক্ত, তার ভূমিকা অপরিসীম। সুবিধাভোগীদের শুধু নেতিবাচক মনোভাবের কারণেই একটি আইন বা আইনের কোনো অংশ বাস্তবায়ন অসম্ভব হতে পারে।
টাইপ মেশিনের পরিবর্তে কম্পিউটার ব্যবহারের সুফলের কথা এখন কে-ই বা অস্বীকার করবে, অথচ দাপ্তরিক কাজে কম্পিউটারের প্রচলনের প্রথম পর্যায়ে খোদ বৃটেনকেই ব্যাপক বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। তাই কোনো একটি আইন প্রয়োগ বা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আইনের সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর মতামত বিশেষভাবে বিবেচনা করা দরকার।
সমাজে কোনো কিছু নতুন, যা মানুষের বংশপরম্পরায় পালিত কোনো প্রথা বা স্বাভাবিক জীবনযাপনকে একটু পরিবর্তনের আভাস দেয়, তা প্রথমে খুব অল্পসংখ্যক মানুষই গ্রহণ করতে আগ্রহী হয়। অধিকাংশই এ বিষয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করে, এমনকি বিরোধিতা করে। মানুষের এ বিরোধিতামূলক সহজাত প্রবৃত্তি এলাকা বা গোষ্ঠীভেদে ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ইমারত বা রাস্তাঘাট নির্মাণ ও সংস্কার, ভূমি অধিগ্রহণসহ ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি বিষয়ে কোনো আইন সমতল এলাকায় বাস্তবায়নে কিছুটা সহজ হলেও পাহাড়ি এলাকায় তা, তথাকার মানুষের প্রথাভিত্তিক জীবনযাপনে কঠোর মানসিকতার কারণে, কঠিন হবে। তাই কোনো আইন বাস্তবায়নের বিষয়ে সেবাভোগীদের থেকে যে প্রশ্ন প্রথম জানা প্রয়োজন তা হলো: তাদের আইন বাস্তবায়নের বিষয়ে কোনো নেতিবাচক মনোভাব বা বিরোধিতা রয়েছে কি না?
দেশের উন্নয়ন তথা আর্থসামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা অক্ষুণ্ন রাখতে আইন গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। আইন সকলকে সমান অধিকার দেয়, আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার প্রবর্তন করে সকলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং সুষ্ঠু জীবনযাপনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। তাই আইনের প্রতি সকল পর্যায়ের মানুষ যথা—আইন প্রণেতা, আইন প্রয়োগকারী ও আইনের সেবাভোগীদের শ্রদ্ধাশীল হওয়া বাঞ্ছনীয়।
তবে সব শ্রেণির মানুষের মধ্যেই দেশের প্রচলিত আইন না মানার প্রবণতা দেখা যায়। ক্ষেত্রবিশেষে তুচ্ছ কারণ দেখিয়ে আইন ভাঙার ঘটনাও ঘটে থাকে। এর মধ্যে সড়কে গাড়ি চালাতে ট্রাফিক সিগন্যাল না মানা, পথচারীর জেব্রা ক্রসিং ফেলে যত্রতত্র রাস্তা পারাপার, তাছাড়া ফুটপাতে চলাচলে বিঘ্ন ঘটিয়ে ব্যবসা করা থেকে শুরু করে আয়কর ফাঁকি এবং ভ্যাট, ট্যাক্স, খাজনা প্রদান প্রভৃতিতে আইন অমান্যের বিষয়গুলো উল্লেখযোগ্য।
এর ফলে একদিকে যেমন সড়কসহ সাধারণের ব্যবহার্য স্থানগুলো অনিরাপদ হচ্ছে, দুর্ঘটনাজনিত কারণে জানমালের ক্ষতি হচ্ছে। অন্যদিকে আর্থিক বিষয়ে আইন মানায় অনিচ্ছা এবং কর, শুল্ক বা খাজনা প্রদানে অনীহার কারণে দেশ ধীরে ধীরে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এজন্য আর্থিক আইন-বিধি বাস্তবায়নে এ প্রশ্ন খুবই যুক্তিযুক্ত যে, আইনের প্রতি দেশের জনপ্রতিনিধি বা নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি থেকে শুরু করে সকল পর্যায়ের সেবাভোগীদের শ্রদ্ধা আছে কি না এবং আইনটি গ্রহণে তাদের ইচ্ছা আছে কি না?
(চলবে…)
লেখক:
এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, সেন্টার ফর স্ট্রাটিজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ
সাবেক অতিরিক্ত সচিব।