• হোম > অর্থনীতি | এক্সক্লুসিভ | জাতীয় | বাংলাদেশ > ২০৩০ সালের মধ্যে একক ১৫ শতাংশ ভ্যাট চালুর পরিকল্পনা সরকারের

২০৩০ সালের মধ্যে একক ১৫ শতাংশ ভ্যাট চালুর পরিকল্পনা সরকারের

  • মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১৭:৪০
  • ২৪

---

ইবি রিপোর্ট

দেশের করব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। বিদ্যমান বিভিন্ন ধরনের মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ছাড় ও অব্যাহতি ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করে ২০৩০ সালের মধ্যে একক ১৫ শতাংশ ভ্যাট হার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবহন খাতকে প্রস্তাবিত প্রমিত হারের বাইরে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ৫০০টিরও বেশি পণ্য ও সেবায় বর্তমানে কার্যকর থাকা রেয়াতি ভ্যাট সুবিধায় পরিবর্তন আসতে পারে।

ওয়াশিংটনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কারিগরি কমিটির সঙ্গে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বৈঠকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রতিনিধি দল পর্যায়ক্রমে ভ্যাট অব্যাহতি প্রত্যাহারের প্রস্তাব দিয়েছে। এনবিআরের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বিষয়টি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) নিশ্চিত করেছেন।

রাজস্ব খাতের সংস্কার প্রস্তাব এবং দেশের সামগ্রিক আর্থিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়নে আগামী নভেম্বরে আইএমএফের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের ঢাকা সফরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

বর্তমানে ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিকস পণ্য, কম্পিউটার সামগ্রী, মেট্রোরেল সেবা, রেস্তোরাঁ, স্যানিটারি ন্যাপকিন ও ডায়াপারসহ ৫০০টির বেশি পণ্য ও সেবায় ২ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাসকৃত ভ্যাট হার প্রযোজ্য। কিছু পণ্য ও সেবা সংবিধিবদ্ধ আদেশের (এসআরও) মাধ্যমে পুরোপুরি ভ্যাট অব্যাহতি পেয়ে থাকে। প্রস্তাবিত সংস্কার অনুযায়ী, এসব সুবিধা পর্যায়ক্রমে তুলে নিয়ে সংশ্লিষ্ট পণ্য ও সেবাকে ১৫ শতাংশ ভ্যাটের আওতায় আনা হবে।

এনবিআরের এক জ্যেষ্ঠ ভ্যাট কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, আইএমএফ জানতে চেয়েছে, বাংলাদেশ কীভাবে নিজস্ব রাজস্ব বাড়াবে এবং ধীরে ধীরে কর অব্যাহতির সুবিধা থেকে বেরিয়ে আসবে। অপরিহার্য কিছু খাতকে ছাড় দিয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে একক ভ্যাট হার চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত কয়েকটি বৈঠকে এ বিষয়ে প্রাথমিক সময়সূচি এবং লক্ষ্যভিত্তিক পণ্য ও সেবার তালিকাও আইএমএফকে জানানো হয়েছে।

প্রস্তাব প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত আরেক কর্মকর্তা জানান, আইএমএফ সব ধরনের ভ্যাট সুবিধা পুরোপুরি বিলোপের পক্ষে ছিল। তবে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, চিকিৎসা এবং শিক্ষা খাতে ছাড় বহাল রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে সরকার।

২০২৩ সালের জানুয়ারিতে অনুমোদিত ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ রাজস্ব আয় বাড়ানোসহ ব্যাংকিং ও জ্বালানি খাতে গভীর সংস্কারের অঙ্গীকার করেছিল। তবে পরে এসব শর্তের কয়েকটি পূরণে পিছিয়ে পড়ে দেশ।

পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয়

২০৩০ সালের মধ্যে একক ভ্যাট হার চালুর পরিকল্পনা কতটা বাস্তবায়নযোগ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদেরা। অতীতে এ ধরনের প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থতার অভিজ্ঞতাকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন তাঁরা।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “সরকার যে এবার তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে—আইএমএফের কাছে তার কী গ্যারান্টি আছে?”

তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে সংস্কার বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেওয়া হলেও আইএমএফের নতুন ঋণ কর্মসূচির মেয়াদ তার আগেই শেষ হয়ে যাবে। তাই কর্মসূচির নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোন কোন পদক্ষেপ বাস্তবায়ন সম্ভব, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত প্রতিশ্রুতি এবং যৌক্তিক ব্যাখ্যা চাইতে পারে সংস্থাটি।

ড. জাহিদ হোসেনের ভাষ্য, বর্তমানে দেশে মোট কর ছাড়ের পরিমাণ জিডিপির প্রায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশ, অথচ প্রকৃত রাজস্ব আদায় মাত্র ৬ দশমিক ৪ শতাংশ। তাঁর মতে, কর সুবিধা প্রত্যাহার করে কত অতিরিক্ত রাজস্ব পাওয়া যাবে, সরকারকে তার হিসাব দিতে হবে।

পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা

ভ্যাট আইনের তিনটি পৃথক তফসিল এবং এনবিআরের বিভিন্ন এসআরওর মাধ্যমে বর্তমানে ৫০০টির বেশি পণ্য ও সেবায় কম হারে ভ্যাট নেওয়া হয়। এসব ক্ষেত্রে একক ১৫ শতাংশ হার কার্যকর হলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় বাড়তে পারে।

এনবিআর কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বৈদ্যুতিক সামগ্রী, গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, কম্পিউটার এক্সেসরিজ, সমুদ্রগামী জাহাজ, মেট্রোরেল, রড-স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম, রেস্তোরাঁ, নন-ব্র্যান্ডের পোশাক, স্যানিটারি ন্যাপকিন ও ডায়াপারের ক্ষেত্রে বর্তমানে ৭ দশমিক ৫ থেকে ১০ শতাংশ রেয়াতি ভ্যাট হার রয়েছে। এসব সুবিধার মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন ও ২০৩০ সালের জুনে শেষ হলে তা আর বাড়ানো হবে না বলে পরিকল্পনা রয়েছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত লিফটের ওপর ২০৩০ সাল পর্যন্ত কার্যকর ১০ শতাংশ রেয়াতি সুবিধাও নবায়ন না করার চিন্তা করছে সরকার।

এ ছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য প্রচলিত প্যাকেজভিত্তিক ভ্যাট হার বাতিল করে প্রমিত হারের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর কম হারে ভ্যাটের বিষয়টিও পর্যালোচনা করা হচ্ছে, যদিও এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

যেসব খাতে ছাড় বহাল থাকতে পারে

নিম্নআয়ের ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে সুরক্ষা দিতে কৃষিপণ্য ও কৃষি উপকরণ এবং চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, লবণ ও মরিচের মতো মৌলিক খাদ্যপণ্যে ভ্যাট ছাড় বহাল রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। গণপরিবহন, প্রাথমিক ও মৌলিক শিক্ষা, সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা এবং জরুরি জীবনরক্ষাকারী ওষুধও এ সুবিধার আওতায় থাকবে।

ব্যবসায়ীদের আপত্তির আশঙ্কা

২০১৫ সালে দেশে ১৫ শতাংশ একক ভ্যাট চালুর উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। তবে ব্যবসায়ীদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে হয়। ড. জাহিদ হোসেনের ধারণা, নতুন করে একই হারে ভ্যাট আরোপের উদ্যোগও ব্যবসায়ীদের বিরোধিতার মুখে পড়তে পারে।

ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক টিবিএসকে বলেন, “একক বা অভিন্ন ভ্যাট হার চালু করা অসম্ভব কিছু নয়, তবে মূল সমস্যাটি হলো ভ্যাটের হারের পরিমাণ নিয়ে। সামগ্রিক ভ্যাটের হার কিছুটা কমিয়ে এনে যদি একটি সুনির্দিষ্ট অভিন্ন হার নির্ধারণ করা হয়, তাহলে ব্যবসায়ীদের আপত্তি করার কোনো বড় কারণ থাকবে না।”

এনবিআরের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিভিন্ন কর ছাড় ও রেয়াতের কারণে ভ্যাট রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হওয়ার পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৩ শতাংশের সমান। একই অর্থবছরে ভ্যাট খাতে প্রকৃত রাজস্ব আদায় হয়েছিল ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, ওই সময়ে ভ্যাট ছাড়ের পরিমাণ রাজস্ব আদায়ের চেয়েও বেশি ছিল।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/20059 ,   Print Date & Time: Tuesday, 20 October 2026, 02:33:20 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh