![]()
ইবি রিপোর্ট
দীর্ঘ ১৬ বছর পর দেশের শেয়ারবাজারে বেসরকারি কোম্পানির জন্য আবারও ‘ডিরেক্ট লিস্টিং’ বা সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ চালু হয়েছে। বিদেশি ও দেশীয় বড় কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আনতে নতুন বিধিমালা করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। গত রোববার এ বিধিমালার গেজেট প্রকাশিত হয়েছে।
এ পদ্ধতিতে কোম্পানিকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে নতুন শেয়ার ছাড়তে হয় না। বরং কোম্পানির উদ্যোক্তা, পরিচালক ও প্রাথমিক শেয়ারহোল্ডাররা নিজেদের হাতে থাকা শেয়ার সরাসরি বাজারে বিক্রি করতে পারেন। তবে এ সুযোগ পেতে কোম্পানিকে নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও শর্ত পূরণ করতে হবে।
২০১০ সালে খুলনা পাওয়ার ও ওশান কনটেইনারের তালিকাভুক্তি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়ার পর বেসরকারি কোম্পানির জন্য ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের সুযোগ বন্ধ রাখা হয়। পরে এ সুবিধা শুধু সরকারি কোম্পানির জন্য সংরক্ষিত করা হলেও কোনো সরকারি কোম্পানিও এ পদ্ধতিতে তালিকাভুক্ত হয়নি।
এরপর ২০১৪ সালে আমান সিমেন্ট এবং ২০২২ সালে বেস্ট হোল্ডিংস ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে শেয়ারবাজারে আসার চেষ্টা করেছিল। তবে বিএসইসি সে সময় উদ্যোগ দুটি আটকে দেয়। আমান গ্রুপের আমান সিমেন্ট ইউনিট-২ কারখানা প্রতিষ্ঠার সময় পুরোনো ও স্বল্প উৎপাদনক্ষম আমান সিমেন্টের শেয়ার বিক্রির চেষ্টা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অন্যদিকে বেস্ট হোল্ডিংসের শেয়ার উচ্চমূল্যে বিক্রির উদ্যোগ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
কোন ধরনের কোম্পানি সুযোগ পাবে
নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, সরকারের অন্তত ১০ শতাংশ মালিকানা রয়েছে—এমন কোম্পানি এবং অন্তত ৫১ শতাংশ বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানি ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের সুযোগ পেতে পারে। এ ছাড়া অন্তত ৫০০ কোটি টাকার নিট সম্পদ থাকা তপশিলি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বীমা কোম্পানি, বার্ষিক অন্তত ১ হাজার কোটি টাকা টার্নওভার থাকা কোম্পানি এবং স্টক এক্সচেঞ্জ বা ডিপোজিটরি প্রতিষ্ঠানও এ সুযোগের আওতায় থাকবে।
সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা যাচাইয়ের শর্তও রাখা হয়েছে। আগ্রহী কোম্পানিকে টানা অন্তত পাঁচ বছর বাণিজ্যিক উৎপাদনে থাকতে হবে। সর্বশেষ দুই অর্থবছরে মূল কার্যক্রম থেকে মুনাফা অর্জন করতে হবে এবং ব্যবসা থেকে নগদ অর্থের প্রবাহ ইতিবাচক থাকতে হবে। পাশাপাশি পুঞ্জীভূত লোকসান থাকা যাবে না। শেয়ার বিক্রির সঙ্গে যুক্ত উদ্যোক্তা বা সংশ্লিষ্ট শেয়ারহোল্ডারদের ঋণখেলাপি হওয়া চলবে না।
তালিকাভুক্তির পর উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে অন্তত ৩০ শতাংশ শেয়ার ধরে রাখতে হবে। এর মাধ্যমে কোম্পানির পরিচালনায় তাঁদের অংশীদারত্ব বজায় রাখার শর্ত দেওয়া হয়েছে।
শেয়ারের দাম নির্ধারণ হবে যেভাবে
নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, কোম্পানির উদ্যোক্তা, পরিচালক ও প্রাথমিক শেয়ারহোল্ডাররা তাঁদের হাতে থাকা শেয়ার বিক্রি করতে পারবেন। তবে পুরো প্রক্রিয়ায় তাঁদের মূল পরিশোধিত মূলধনের অন্তত ১০ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করতে হবে।
শেয়ারের যৌক্তিক মূল্য বা ‘রেফারেন্স প্রাইস’ নির্ধারণে মার্চেন্ট ব্যাংকারের পরামর্শ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোম্পানির সম্পদ, দায় ও আয় বিবেচনায় নেওয়া হবে। নির্ধারিত রেফারেন্স মূল্যের চেয়ে অন্তত ২৫ শতাংশ কমিয়ে শেয়ার বিক্রির সর্বনিম্ন মূল্য প্রকাশ করতে হবে। তবে প্রথম দুই দিনে বিনিয়োগকারীরা প্রকাশিত সর্বনিম্ন দরের চেয়ে কম মূল্যে শেয়ার কেনার আদেশ দিতে পারবেন না।
আইপিওশূন্য বাজারে নতুন উদ্যোগ
টানা দুই বছরের বেশি সময় ধরে আইপিও না আসায় শেয়ারবাজারে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির গতি বাড়ানো বিএসইসির অন্যতম লক্ষ্য। কমিশনের চেয়ারম্যান মাসুদ খান দায়িত্ব নেওয়ার পর বাজারে নতুন কোম্পানি আনতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছেন। এর অংশ হিসেবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য ডিরেক্ট লিস্টিং পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিএসইসির ধারণা, কিছু বড় ও প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি শেয়ারের কাঙ্ক্ষিত মূল্য না পাওয়া, নতুন মূলধনের প্রয়োজন না থাকা এবং আইপিওর দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে বাজারে আসতে আগ্রহী হয় না। সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য বিকল্প পথ তৈরি করতে পারে।
তবে অতীতের বিতর্কের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে এবার স্টক এক্সচেঞ্জের লিস্টিং রেগুলেশনের পরিবর্তে পৃথক বিধিমালা করা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় কোম্পানির যোগ্যতা, আর্থিক অবস্থা, উদ্যোক্তাদের শেয়ার ধারণ এবং শেয়ারের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে একাধিক শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। এসব শর্তের বাস্তব প্রয়োগ ও তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মান বজায় রাখার ওপর নতুন ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করবে।