• হোম > অর্থনীতি | জাতীয় | দেশজুড়ে > ইইউর নতুন নীতিমালায় ঝুঁকিতে বাংলাদেশের স্ক্র্যাপ ইস্পাত আমদানি

ইইউর নতুন নীতিমালায় ঝুঁকিতে বাংলাদেশের স্ক্র্যাপ ইস্পাত আমদানি

  • মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:৫৫
  • ১৩

---

ইবি রিপোর্ট

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নতুন বর্জ্য পরিবহন নীতিমালার খসড়া তালিকায় বাংলাদেশ থেকে আমদানিযোগ্য বর্জ্যের তালিকায় ধাতব বর্জ্য রাখা হয়নি। ফলে চূড়ান্ত তালিকায় এ সিদ্ধান্ত বহাল থাকলে ২০২৭ সালের ২১ মে থেকে ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে ফেরাস স্ক্র্যাপ আমদানির সুযোগ হারাতে পারে বাংলাদেশ। এতে দেশের ইস্পাত শিল্পে কাঁচামাল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় ও ইস্পাতপণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

খসড়া তালিকায় বাংলাদেশকে কাগজ ও রাবার বর্জ্য আমদানির অনুমতি দেওয়া হলেও ধাতব বর্জ্যের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ রাখা হয়নি। তবে তালিকাটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ধাতব বর্জ্য আমদানির অনুমোদিত তালিকায় বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে সরকার পর্যালোচনা প্রক্রিয়ায় কাজ করছে।

দেশের ইস্পাত উৎপাদনকারীরা এমনিতেই গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির চাপে রয়েছেন। বিলেট ও রিইনফোর্সিং বার বা রিবার উৎপাদনে আমদানিকৃত স্ক্র্যাপের ওপর নির্ভরশীল এ খাতের জন্য ইউরোপীয় বাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

শিল্প বিশ্লেষক ও জাগুয়ার রিসোর্স অ্যান্ড ক্যাপিটাল প্রাইভেট লিমিটেডের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ ইফতেখার আহমেদ বলেন, ঐতিহাসিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের স্ক্র্যাপ ইস্পাত আমদানির অন্যতম প্রধান উৎস। তাঁর হিসাবে, দেশে আমদানি করা স্ক্র্যাপের ৬০ শতাংশের বেশি একসময় ইইউভুক্ত দেশগুলো থেকে আসত। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে এ উৎস থেকে আমদানি কিছুটা কমলেও দীর্ঘ মেয়াদে তালিকা থেকে বাদ পড়লে বাজারে স্ক্র্যাপের দামে প্রভাব পড়তে পারে।

বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সুমন চৌধুরী বলেন, গত তিন বছর ধরে দেশের ইস্পাত খাত নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইউরোপ থেকে স্ক্র্যাপ আমদানির সুযোগ হারালে শিল্পটি আরও চাপে পড়বে এবং ইস্পাতপণ্যের দাম বাড়তে পারে।

আমদানিনির্ভর কাঁচামাল সরবরাহ

২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে প্রায় ৫২ লাখ ৯০ হাজার টন ফেরাস স্ক্র্যাপ আমদানি করা হয়। বিপরীতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে পাওয়া যায় প্রায় ১০ লাখ টন। সব মিলিয়ে ৬২ লাখ ৯০ হাজার টন সরবরাহের প্রায় ৮৪ শতাংশই এসেছে আমদানির মাধ্যমে।

ইইউ থেকে সরবরাহ বন্ধ হলে উৎপাদকদের বিকল্প বাজার থেকে স্ক্র্যাপ সংগ্রহ করতে হবে। এতে অন্যান্য বাজারের সরবরাহকারীদের কাছ থেকে কাঁচামাল সংগ্রহে প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে স্ক্র্যাপের দাম ও জাহাজভাড়া বেড়ে গেলে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে।

বিএসআরএমের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত বলেন, ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে আসা স্ক্র্যাপের মান ভালো। এ উৎস থেকে আমদানি বন্ধ হলে দেশের ইস্পাত শিল্প বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে পারে। তাঁর মতে, স্ক্র্যাপের দাম বাড়লে উৎপাদকদের রিবারসহ অন্যান্য ইস্পাতপণ্যের দামও বাড়াতে হতে পারে।

তবে দাম কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করবে বিকল্প উৎস থেকে কাঁচামালের সরবরাহ, জাহাজভাড়া, বিনিময় হার, কারখানার মজুত এবং উৎপাদকেরা বাড়তি ব্যয় ক্রেতাদের ওপর কতটা চাপাতে পারবেন, তার ওপর।

পরিবেশগত শর্ত পূরণে ঘাটতি

ইইউর সংশোধিত বর্জ্য পরিবহন বিধিমালা—রেগুলেশন (ইইউ) ২০২৪/১১৫৭—২০২৪ সালের ২০ মে কার্যকর হয়েছে। এর আওতায় ওইসিডির সদস্য নয়, এমন দেশগুলো ইউরোপীয় কমিশনের অনুমোদিত তালিকায় থাকা নির্দিষ্ট বর্জ্যই আমদানি করতে পারবে। এ অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট বর্জ্য পরিবেশবান্ধবভাবে ব্যবস্থাপনার সক্ষমতার প্রমাণ দিতে হয়।

বাংলাদেশ ২০২৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি নির্দিষ্ট কিছু বর্জ্য আমদানির অনুমোদন পেতে আবেদন জমা দেয়। ইউরোপীয় কমিশনের মূল্যায়নে কাগজ ও রাবার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার শর্ত পূরণের প্রমাণ পাওয়া গেলেও ধাতব বর্জ্যের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরিবেশগত ব্যবস্থার পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ধাতব বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করার সময় সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম ও হেক্সাভ্যালেন্ট ক্রোমিয়ামের মতো ক্ষতিকর উপাদান নির্গত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। যথাযথ সুরক্ষাব্যবস্থা না থাকলে শ্রেডিং, গলানো ও পরিশোধনের সময় পরিবেশদূষণ ঘটতে পারে।

ইফতেখার আহমেদ বলেন, তালিকায় বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে পরিবেশগত শর্ত পূরণ জরুরি। এ ক্ষেত্রে শিল্প উদ্যোক্তা ও সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

তালিকায় অন্তর্ভুক্তির চেষ্টা সরকারের

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (এফটিএ-২) মাহবুবা খাতুন মিনু বলেন, তালিকায় বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির জন্য আবেদন করা হয়েছে এবং তা এখন পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। ইউরোপীয় কমিশন বাংলাদেশের পরিবেশগত মানদণ্ড পরিপালন নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তানসহ আরও কয়েকটি দেশ খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। বাংলাদেশের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে।

২০২৬ সালের শেষ নাগাদ অনুমোদিত গন্তব্য দেশগুলোর প্রথম তালিকা চূড়ান্ত করার কথা রয়েছে ইউরোপীয় কমিশনের। নতুন নিয়ম ২০২৭ সালের ২১ মে থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। ফলে চূড়ান্ত তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে, তার ওপর দেশের ইস্পাত শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ ও উৎপাদন ব্যয়ের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/20023 ,   Print Date & Time: Tuesday, 20 October 2026, 10:13:12 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh