![]()
ইবি রিপোর্ট
বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচিতে ঋণ বিতরণে গতি এসেছে। গত ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত এ কর্মসূচির আওতায় ৫৬০ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) প্রত্যয়ন পাওয়া প্রায় ২০০টি পোশাক কারখানার কোনোটিই এখনো ঋণের অর্থ পায়নি বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ কর্মসূচির আওতায় ব্যাংকগুলো মোট ১ হাজার ৪৯০ কোটি টাকার ঋণ আবেদন জমা দিয়েছে। এর মধ্যে ৫৬০ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। আরও ৯২৯ কোটি টাকার ঋণ বিতরণের প্রক্রিয়া চলছে।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কর্মসূচিটিতে ৮০০ কোটি টাকার ঋণ আবেদন জমা পড়েছিল। সে সময় আটটি প্রতিষ্ঠানকে ১১০ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়। পরবর্তী ১৮ দিনে বিতরণের পরিমাণ বেড়ে ৫৬০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
তবে পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থ ছাড়ের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিজিএমইএর সহসভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী বলেন, তাঁদের জানা মতে, এ কর্মসূচির আওতায় এখন পর্যন্ত কোনো পোশাক কারখানা ঋণের অর্থ পায়নি। এ ছাড়া চারটি কারখানার মালিক জানিয়েছেন, তাঁরাও ঋণ ছাড়ের অপেক্ষায় রয়েছেন।
ঋণের ঝুঁকি ব্যাংকের, তাই সতর্কতা
বাংলাদেশ ব্যাংক গত জুনে এ কর্মসূচি ঘোষণা করলেও আবেদন গ্রহণ ও যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ব্যাংকগুলোর অক্টোবর পর্যন্ত সময় লেগেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তুলনামূলক কম সুদে তহবিল সরবরাহ করলেও ঋণের পুরো ঝুঁকি বহন করতে হচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে।
ঋণপ্রত্যাশী প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সক্ষমতা, আর্থিক অবস্থা এবং ভবিষ্যতে টিকে থাকার সম্ভাবনা যাচাইয়ের দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের। এ ব্যবস্থায় উদ্যোক্তারা প্রথমে বাণিজ্যিক ব্যাংকে আবেদন করেন। ব্যাংক আবেদন যাচাই করে অনুমোদন দিলে অর্থায়নের জন্য তা বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হয়।
ঋণের ঝুঁকি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর থাকায় বিতরণে ধীরগতি তৈরি হয়ে থাকতে পারে। তবে বিলম্বের সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য পাওয়া যায়নি।
বৃহত্তর পুনঃঅর্থায়ন প্যাকেজ ঘোষণার সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেছিলেন, এ উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।
১৫টি কর্মসূচিতে ১১,৯৫৯ কোটি টাকা বিতরণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মোট ৬০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের ১৫টি পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচিতে ১৪ হাজার ৫১৯ কোটি টাকার ঋণ আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ১১ হাজার ৯৫৯ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। বাকি ২ হাজার ৫৬০ কোটি টাকার আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
মোট বরাদ্দের মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়নের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়ার কথা রয়েছে।
বিভিন্ন কর্মসূচিতে ঋণ বিতরণের অগ্রগতিতে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচিতে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ৬ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা বিতরণ হয়েছে, যা বরাদ্দের চেয়ে ৩৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেশি। কুটির ও মাইক্রো উদ্যোক্তাদের বিশেষ কর্মসূচিতে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে বিতরণ হয়েছে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, অর্থাৎ বাস্তবায়নের হার ৫০ শতাংশ।
সিএমএসএমই খাতের চলতি মূলধন পুনঃঅর্থায়ন তহবিলে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে বিতরণ হয়েছে ৯০৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। অন্যদিকে, সৃজনশীল অর্থনীতি কর্মসূচিতে বরাদ্দের পুরো ৫০০ কোটি টাকাই বিতরণ করা হয়েছে।
কয়েকটি কর্মসূচিতে অগ্রগতি কম
বিদেশে কর্মসংস্থান অর্থায়ন কর্মসূচিতে ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ২০০ কোটি টাকা বিতরণ হয়েছে। কৃষি ও গ্রামীণ খাদ্যনিরাপত্তা পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচিতে ১০ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দের বিপরীতে বিতরণ হয়েছে মাত্র ২৯২ কোটি ৯০ লাখ টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
উত্তরবঙ্গে কৃষিভিত্তিক বিশেষ অর্থনৈতিক কেন্দ্র কর্মসূচিতে ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে বিতরণ হয়েছে ৪৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। স্টার্টআপ খাতে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে বিতরণ করা হয়েছে ৩২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা; আরও ৫ কোটি টাকার আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান অর্থায়ন কর্মসূচিতে ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পুরো অর্থ বিতরণের প্রক্রিয়ায় থাকলেও ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত কোনো ঋণ বিতরণ হয়নি। পরিবেশবান্ধব কারখানা ভবন ও সবুজ শিল্প পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচিতে ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ৫২৭ কোটি ৪৭ লাখ টাকার আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা রপ্তানি খাতের ২ হাজার কোটি টাকার কর্মসূচিতেও ৯৮ কোটি টাকার আবেদন প্রক্রিয়াধীন থাকলেও এখনো ঋণ বিতরণ হয়নি।
এ ছাড়া রপ্তানি বহুমুখীকরণ, গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীলকরণ এবং হিমায়িত চিংড়ি ও অন্যান্য মাছ রপ্তানি খাতের তিনটি কর্মসূচিতে এখনো ঋণ বিতরণ হয়নি, এমনকি কোনো আবেদনও প্রক্রিয়াধীন নেই। এ তিন কর্মসূচিতে মোট ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচিগুলোতে ঋণ বিতরণ এগোলেও বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগে অর্থ ছাড়ের গতি এবং পোশাক খাতের আবেদনকারীদের ঋণপ্রাপ্তি এখনো নজরদারির বিষয় হয়ে রয়েছে।